প্রাণে বাঁচলেও এখন বেতন-বোনাস নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন হাসেম ফুডসের শ্রমিকরা। অগ্নিকাণ্ডের পর হাসেম ফুডসের সবগুলো কারখানাই বন্ধ। প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কারখানাগুলোতে কাজ করেন। এদিকে মারা যাওয়া ৫২ জন শ্রমিকের কেউই জুন মাসের বেতন পাননি। তাদের বেতনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার পুড়ে যাওয়া কারখানার সামনে অনেক শ্রমিক ভিড় করেন। সবার চোখেমুখে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার ছাপ। এদিকে কারখানাটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলো একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। যদিও তাদের সবার কাজেই ছিল উদাসীনতা। কেউই সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি।
হাশেম ফুডের মালিক এম এ হাশেম ও তার চার ছেলেসহ মোট আট জনের রিমান্ডের গতকাল ছিল তৃতীয় দিন। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে কারখানা-মালিক এম এ হাশেমকে জিজ্ঞাসাবাদে ঐ কারখানা স্থাপনে নানা ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার কিছু প্রমাণ মিলেছে। অপরদিকে রূপগঞ্জের সেই কারখানাটিতে এখন ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। হাজারো শ্রমিকের উপস্থিতিতে যে কারখানা ছিল মুখরিত, সেখানে এখন সুনশান নীরবতা। নিহত শ্রমিকদের স্বজনরা এখনো কারখানার সামনে এসে ভিড় জমাচ্ছেন। বেতন-বোনাসের পাশাপাশি তারা স্বজনের লাশটিও চাচ্ছেন। আগুনে ভস্মীভূূত কারখানার প্রতিটি ফ্লোরে এখন শুধু পোড়া গন্ধ।
জানা গেছে, জরুরি এক্সিট বা নির্গমনে বিকল্প সিঁড়ি বা পথের ব্যবস্থা না থাকলে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি দেওয়ার কোনো বিধান নেই। তারপরেও এই ফ্যাক্টরিতে ছিল ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনপত্র। শুধু তাই নয়, ভবনটিতে ছিল না কোনো ফায়ার অ্যালার্ম, হাইড্রেন্ট সিস্টেমের মতো পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামও। বিশাল বিশাল প্রতি ফ্লোরে নামমাত্র দুই-তিনটি ফায়ার এক্সটিংগুইসার থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের নিয়ম শেখানো হয়নি শ্রমিকদের। যেখানে প্রতি বছর অগ্নি মহড়া হওয়ার কথা ছিল, সেটিও কখনো হয়নি।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, আমাদের কর্মকর্তারা প্রতি মাসে সেখানে পরিদর্শনে যেতেন। কারখানা পরিদর্শনের সময় কর্তারা মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়ে থাকেন। আমরা ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স পাওয়ার পরেই তাদের সনদ দিয়েছি।
তবে ফায়ার সার্ভিসের দাবি, তারা দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে অনেক বার সতর্ক করে নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু রাসায়নিক দ্রব্য দেখভালের দায়িত্ব তাদের নয়। ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (রূপগঞ্জ) তানহারুল ইসলাম জানান, কেমিক্যাল দেখার দায়িত্ব অন্য সংস্থার। আমরা পর্যাপ্ত ফায়ার সেফটির বিষয়ে প্রতিটি কারখানাকে নোটিশ করে থাকি। এই কারখানা কর্তৃপক্ষকে অনেক বার নোটিশ করা হয়েছিল। আর শ্রমিকদের বিষয়টি কলকারখানা অধিদপ্তরও তদারকি করে। তবে কেন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা ।
কলকারখানা অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ফায়ার সেফটি ও কেমিক্যালের বিষয়গুলো পরিবেশ অধিদপ্তর দেখে। আমরা অন্য বিষয়গুলো দেখি। তবে শিশুশ্রমিকদের সেখানে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
রূপগঞ্জের সেজান জুস কারখানার সেই মৃত্যুপুরীতে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পৃথক তদন্ত কমিটি। উভয় তদন্ত কমিটির সদস্যরাই কথা বলা শুরু করেছেন মর্মান্তিক ঐ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে।
এদিকে রূপগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের সুচিকিত্সা ও পুনর্বাসনের দাবিতে গতকাল বাম গণতান্ত্রিক জোট মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে তারা এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
মানববন্ধনপূর্বক সভায় বক্তব্য রাখেন—বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোশারফ হোসেন নান্নু, বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সমন্বয়ক বজরুল রশীদ ফিরোজ, ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ আল কাফি রতন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বাম জোট ও বাসদের সমন্বয়ক নিখিল দাস, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মন্টু ঘোষ, গণসংহতি আন্দোলনের তরিকুল সুজন, বাসদ নেতা সেলিম মাসুদ, ওয়ার্কার্স পার্টির স্থানীয় নেতা সোহেল, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের সবুজ প্রমুখ। সভায় বক্তারা বলেন, মালিক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরগুলোর অবহেলায় আর কত শ্রমিকের জীবন দিতে হবে? রানা প্লাজা, তাজরীন, টাম্পাকোর ঘটনায় দোষীদের উপযুক্ত বিচার হলে সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে ৫২ জন শ্রমিকের জীবন দিতে হতো না।