জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির কারণে বিশ্বে ক্ষুধা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আফ্রিকায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ বা ৮১ কোটি ১০ লাখ মানুষ গত বছর অপুষ্টিতে ভোগে।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যার বেশির ভাগই সম্ভবত কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও মহামারির প্রভাব এখনো পুরোপুরি খতিয়ে দেখা হয়নি। কয়েকটি সংস্থার (মাল্টি-এজেন্সি) এক যৌথ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ‘বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের এই বছরের সংস্করণটি মহামারিকালে এ জাতীয় প্রথম বৈশ্বিক মূল্যায়ন। যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগানাইজেশন (এফএও), ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি), ইউনাইটেড নেশন্স চিলড্রেন্স ফান্ড (ইউনিসেফ), ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (ডব্লিউএইচও)।
এই প্রতিবেদনের আগের সংস্করণগুলোতে ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
এই বছরের প্রতিবেদনের ভূমিকায় জাতিসংঘের পাঁচ সংস্থার প্রধানরা লিখেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মহামারি অব্যাহতভাবে আমাদের খাদ্য-ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে চলেছে, যা বিশ্ব জুড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি আসন্ন জাতিসংঘ খাদ্য সম্মেলন, পুষ্টিবিষয়ক সম্মেলন এবং জলবায়ুবিষয়ক কপ-২৬ সম্মেলনে খাদ্য-ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির বিষয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অপুষ্টির শিকার মানুষের অর্ধেকেরও বেশি (৪১ কোটি ৮ লাখ) এশিয়ায় এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি (২৮ কোটি ২০ লাখ) আফ্রিকায় বসবাস করে। আর অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ (৬ কোটি) লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বাস করে। তবে ক্ষুধা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আফ্রিকায়, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশই অপুষ্টির শিকার, যা অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ। পরিমাপের অন্য সূচকেও ২০২০ সালটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সামগ্রিকভাবে, ২৩০ কোটিরও বেশি মানুষের (বা বিশ্বের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ) বছর জুড়ে পর্যাপ্ত খাবারের অভাব ছিল: মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রাদুর্ভাব হিসেবে পরিচিত এই সূচকের এক বছরের বৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের সম্মিলিত বৃদ্ধির সমান ছিল। লিঙ্গবৈষম্য গভীরতর হয়েছে : ২০২০ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা প্রতি ১০ জন পুরুষের বিপরীতে নারীর সংখ্যা ছিল ১১ জন (২০১৯ সালের ১০.৬ থেকে বেশি)।
অপুষ্টির সবগুলো ধরনই বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২০ সালে পাঁচ বছরের কমবয়সি ১৪ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল খর্বকায় বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাসম্পন্ন; ৪ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি শিশু ছিল রোগা বা উচ্চতার তুলনায় শীর্ণকায় এবং প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ শিশুর ওজন ছিল নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। ৩০০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বঞ্চিত ছিল, যার বড় কারণ খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য। প্রজনন বয়সি নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। বিশ্বব্যাপী কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে, যেমন অনেক শিশুকে এখন শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। তবে তা সত্ত্বেও ২০৩০ সালের মধ্যে পুষ্টির কোনো সূচকে লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব সঠিক পথে নেই।