মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের একটি প্রস্তাব গতকাল সোমবার জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। বিনাভোটেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। গতকাল সন্ধ্যায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানায়।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই প্রথম কোনো প্রস্তাব বিনা ভোটে জাতিসংঘে গৃহীত হলো। সেই বিবেচনায় এবার প্রস্তাবটি পাস হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক। বাংলাদেশের উদ্যোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে ‘রোহিঙ্গা, মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি পেশ করা হয় ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সব সদস্যরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।
গত এক মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে নিবিড় ও সুদীর্ঘ আপস-আলোচনা পর এটি সম্ভব হয়। কূটনীতির বিচারে এটি একটি বড় অর্জন। কারণ, মিয়ানমারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে প্রথম থেকেই প্রস্তাবের বিভিন্ন বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রবল মতবিরোধ ছিল। একদিকে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র ইরান, মিসর ও অন্যান্যরা মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তাবে কোনও কিছু অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধী ছিল। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখ না থাকলে ভোটদানে বিরত থাকার হুমকি দেয়। চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তি বরাবরই যেকোনও ধরনের রোহিঙ্গা রেজ্যুলেশনের বিরোধিতা করে আসছে। প্রস্তাবটিতে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। এছাড়া তাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া পর্যন্ত এ দায়িত্ব বহনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়।
গৃহীত প্রস্তাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধসহ সব প্রকার নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকেও সমর্থন জানানো হয়। এছাড়া প্রস্তাবটিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলমান সব প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে এ রূপ পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এখতিয়ারের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
প্রস্তাবে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারকে মিয়ানমার বিষয়ক ‘নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধানী মিশন’ এর সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর মানবাধিকার পরিষদ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রতিবেদন উপস্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া এ প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল কারণ’ বিষয়ে মানবাধিকার পরিষদে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়।