মোঘল সম্রাট শাজাহান তার স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতি রক্ষার জন্য ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ যমুনা নদীর তীরে তৈরি করেছিলেন তাজমহল। প্রেমের অপূর্ব নিদর্শন আগ্রার এই তাজমহল এখনও পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি। তবে এটা হয়তো অনেকেই জানেন না যে, তাজমহলের মতো আরেকটি ভালোবাসার নিদর্শন রয়েছে এই উপমহাদেশে। আর এটি রয়েছে ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে। ভালোবাসার এই দ্বিতীয় নিদর্শনটির নাম ‘রানীমহল’। তবে স্থানীয় লোকদের কাছে এটি তাজমহল নামেই পরিচিত। অনেকে মধুচন্দ্রিমার জন্য বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান। বেশিরভাগই যেতে চান ভালবাসার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আগ্রার তাজমহলে। কিন্তু এর বাইরে অনেকে ঘুুরতে যান হিমালয় কন্যা নামে পরিচিত দেশ নেপালের রানীমহলে অর্থাত্ এই দ্বিতীয় তাজমহলে।
নেপালের এই তাজমহলটি তৈরি করা হয় উনিশ শতকে। জানা যায়, ১৮৯৭ সালে নেপালের খাজা শমসের জং বাহাদুর রানা নামে একজন অভিজাত ব্যক্তি তার স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করেন। তাদের বাসস্থান ছিল প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য গোয়ালিওরের রাজমাতায়। তিনি ছিলেন নেপাল সেনাবাহিনীর প্রধান। তিনি ষড়যন্ত্র করে আপন চাচা রানাদিপ সিং বাহাদুরকে তার আপন ভাই বীরকে দিয়ে খুন করেন। কিন্তু ক্ষমতা লাভের উচ্চ আশায় সেই ভাই একসময় রানার ইচ্ছাপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তাকে নেপালের পশ্চিমাঞ্চল পালপাতে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বীর নেপালের সিংহাসনে বসেন এবং তার সেনাবাহিনীর পদটিও কেড়ে নেন। পরে নির্বাসিত অবস্থায় বাহাদুর রানা বেনারসে মৃত্যুবরণ করেন।
নির্বাসিত জীবনে রানার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী তেজকুমারী। কালিগান্ধারি নদীর তীর এবং আশপাশের ছোট পাহাড়গুলোর মোহনীয় দৃশ্য তাদের দুঃসহ জীবনে অনেকখানি স্বস্তি দিয়েছিল। রানী তেজকুমারী প্রায়ই তার অপঘাতে মৃত্যু হবে এমন আশংকায় অস্থির থাকতেন। তাই সবাই যেন তাকে চিরদিন মনে রাখে এবং তার স্মৃতিকে অমর করে রাখে এজন্য স্বামীর কাছে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি স্বামীকে অনুরোধ করেন, মারা যাওয়ার পর তার জন্য যেন একটি দু’তলা প্রাসাদের সৌধ নির্মাণ করা হয়। এই সৌধটি হবে তার সমাধির চারদিক ঘিরে। আর পাদদেশ জুড়ে থাকবে নয়নাভিরাম ফুলের বাগান।
রানী তেজকুমারীর মৃত্যুর পর বাহাদুর রানা তার স্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। কিন্তু রানার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা এটিকে একজন বিতাড়িত এবং নির্বাসিত ব্যক্তির সম্পদ বলে উপেক্ষা করেন। তারপর অযত্ন ও অবহেলায় কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। প্রায় একশ’ বছর পর অর্থাত্ ১৯৯৮ সালে নেপালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রানীমহলটিকে তাদের তত্ত্বাবধানে নেয়। নিখুঁতভাবে এর সংস্কার কাজ শুরু করেন। স্থাপনাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৩শ’ ফুট উচ্চতার শহর নেপালের দার্জিলিং খ্যাত তানসেনে অবস্থিত। এই রানীমহলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অনবদ্য প্রেম, ভীতি এবং মর্মান্তিক নির্বাসনের কাহিনী। পর্যটকদের ভিড় প্রতিনিয়তই লেগে থাকে ভালোবাসার নিদর্শন এই দ্বিতীয় তাজমহলটির অপূর্ব রূপ দেখার জন্য।
্রপ্রদীপ সাহা