ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সমকালীন পরিস্থিতি ও সমাধান

মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

“প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ১৯৯২” মোতাবেক বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারিখাতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। তত্পরবর্তিতে আইনটি ১৯৯৮সালে কিছুটা সংশোধন করা হয়, যা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ১৯৯২ এন্ড ইটস এমেন্ডমেন্ট ১৯৯৮” নামে পরিচিত। আইনটি সর্বশেষ সমন্বিত আকারে গেজেটভূক্ত হয় ২০১০ সালের ১৮ জুলাই, “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” নামে।

অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে বেসরকারি কিছু ইন্সটিটিউট ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই) শুরু করে। তারা সেসময় শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন গ্রহণের চেষ্টা করছিলো কিন্তু তখন এ সংক্রান্ত কোনো আইন ছিল না, এমনকি সমস্যাটি সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ে কোনো ডেস্ক পর্যন্ত ছিল না বা এর উপযোগিতাও তৈরি হয়নি। এসব ইন্সটিটিউট এর উদ্যেক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্যোগে ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সমূহের মধ্যে কয়েক বছরব্যাপী দফায় দফায় বৈঠক, সংলাপ, সেমিনার ও অন্যান্য উদ্যোগের পর শিক্ষামন্ত্রণালয় সিবিএইচই’র প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় এবং “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” আইনটিতে অনুমোদন নিয়ে সিবিএইচই পরিচালনার বিধানটি সংযুক্ত করা হয়। এই আইনের ৩৯ (২) বিধান অনুযায়ী, শিক্ষামন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল একটি প্রবিধান প্রণয়ন করে ও ইউজিসি সিবিএইচই পরিচালনায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠান সমূহকে অধিভূক্তি গ্রহণের আবেদনের আহ্বান জানিয়ে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় নোটিশ প্রকাশ করে। যতদূর জানা যায় তখন থেকে এখন অব্দি সাকূল্যে ১৪টি আবেদন জমা পড়েছে। একই প্রবিধান অনুযায়ী ইউজিসির তত্কালীন চেয়ারম্যান মহোদয়ের নেতৃত্বে, শিক্ষামন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল সিবিএইচই প্রোভাইডারদেও ৭টি বৈদেশিক ক্যাম্পাস (৬টি যুক্তরাজ্যে ও একটি অস্ট্রেলিয়া) পরিদর্শন করেন। ইতোমধ্যে একটি স্টাডি সেন্টারকে ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যাদেও সিবিএইচই পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা সিবিএইচই ক্যাম্পাস/স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন সংক্রান্তাদের যৌক্তিক মতামত তুলে ধরেছে, যা “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” এর সঙ্গেও খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। অতএব, এমন পরিস্থিতিতে সমাধান কী? এরসমাধান খুঁজতে হলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

দৃশ্যপট :বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাত্রা শুরুর পর থেকে নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় তিনদশক অতিক্রম করেছে। এখন এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটির অস্তিত্ব একপ্রকার দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিছুকিছু ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকল্পনয়, বরং তারা স্বীয় শক্তি নিয়েই দাঁড়িয়ে গেছে। শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও সুযোগ না পেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতো। তবে সেই দৃশ্য এখন কিছুটা হলেও পাল্টে গেছে। এখন বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গুনগতমানে এতটাই উের গেছে যে শিক্ষার্থীরা কোনো বিকল্প না খুঁজে সরাসরি সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে যেতো তাদেরই অধিকাংশ এখন দেশেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমেছে।

কিছুকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাখাতে অসাধারণ কাজ করছে। অথচ একসময় গবেষণা না করার জন্য এদেরকে অভিযুক্ত করা হতো।

অন্যদিকে, কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে না পেরে নানা সমস্যা মোকাবেলা করছে এবং শিক্ষার গুণগতমান অর্জন করতে পারছেনা। তারা ভবন ভাড়া, বেতন, গবেষণা তহবিল, স্থায়ী ক্যাম্পাস উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করতে ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।  এছাড়াও অন্যান্য প্রচুর বাধা আছে (যেমন নতুন প্রোগ্রাম অনুমোদন নেওয়া, ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি ইত্যাদি)। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু সরকারী অনুদান নেই, সেহেতু শিক্ষার্থী সংখ্যা ও তাদের টিউশন ফি’র উপরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাস্টেইনেবিলিটি নির্ভর করে।

দৃশ্যপট :বেসরকারি সিবিএইচই প্রোভাইডার্স

১৯৮৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়ে দূরশিক্ষণ ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম এবং ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যেও এনসিসি এডুকেশনের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) প্রোগ্রাম চালু হয়। এরপরে বেশকিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের বেশকিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইন, আইটি ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে অনার্স প্রোগ্রাম চালু করে। প্রতিবছর কয়েক হাজার গ্রাজুয়েট এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সফলতার সাথে পাশ করে বের হচ্ছে এবং তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। দূরশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রাজুয়েট হওয়া এসব শিক্ষার্থীর সাফল্য উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগ গ্রাজুয়েট ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট সনদ অর্জন করেছে। এসব ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলাদেশে চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। সিবিএইচই পরিচালনা করে এমনসব প্রতিষ্ঠান অনেকবার ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং অবেদন জানিয়েছে, কিন্তু কোনো অনুমোদন মেলেনি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, সম্ভাবনাময় সিবিএইচই সেক্টর নিয়ে কাজ করার মতো কোনো ডেস্ক পর্যন্ত নেই।

যাইহোক, নানা বৈঠক, সংলাপ, সেমিনার ইত্যাদির পর শেষমেশ ইউজিসি ও মন্ত্রণালয় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” প্রণয়ন করে এবং এই আইনের আলোকে ২০১৪ সালে একটি প্রবিধান তৈরি করে, যার ৪(৩)-ঝ ধারা অনুসারে বিদ্যমান সিবিএইচই  প্রোভাইডারদের অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে।

অন্যদিকে, করোনা মহামারির কারণে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক পরিসরে অনলাইন শিক্ষা এক নতুন বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি চলতে থাকবে এবং করোনার পরেও আমাদেরকে নতুন স্বাভাবিকতা হিসেবে অনলাইনকে মেনে নিতে হবে। আমরা মনে করছিনা যে অনলাইন শিক্ষা ক্লাসরুম শিক্ষার বিকল্প হয়ে উঠবে। তবে দুই মাধ্যমের সংমিশ্রণে একটি  “ব্লেন্ডেড লার্নিং” বা “হাইব্রিডমডেল” চালু থাকবে। ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই)-এর সঙ্গে এধরনের শিক্ষার মিল রয়েছে। আমরা এখনই যদি এই নতুন স্বাভাবিকতাকে আত্মস্থ করতে না পারি, তবে বিশ্বায়নের এই যুগে জাতি হিসেবে নিঃসন্দেহে পিছিয়ে পরব।

সিবিএইচই এবং এর ইউনেস্কো সংজ্ঞা:

ইউনেস্কোর সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন হচ্ছে,  এমন একধরনের শিক্ষা যেখানে ছাত্র, শিক্ষক, প্রোগ্রাম, শিক্ষাউপকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জাতীয় সীমা অতিক্রম করে থাকে। ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশনকে পাবলিক, প্রাইভেট এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। মুখোমুখি শিক্ষার সম্প্রসারণ হিসেবে (বিদেশে ভ্রমণকারী শিক্ষার্থী এবং বিদেশি ক্যাম্পাসে পড়া শিক্ষার্থী) দূরশিক্ষণকে (বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে) গ্রহণ করা যেতে পারে। ইউনেস্কোর সনদ স্বাক্ষরিত সদস্যভূক্ত দেশ হিসেবে এবং সিবিএইচই’র পক্ষে যেহেতু উচ্চআদালতের রায় রয়েছে, সেহেতু ক্রসবর্ডার হায়ার এডুকেশনের অনুমোদন দেয়া থেকে পিছিয়ে আসার কোন সুযোগ নেই।

প্রস্তাবিত সমাধান

সিবিএইচই বিদেশি প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দেশের ছোটখাটো ইনস্টিটিউটগুলোর সম্পৃক্ততা নির্দেশ করে, যাদেরকে “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” এর অনেক কিছুই মানার বাধ্যবাধকতা নেই। তদুপরি আইন ও প্রবিধানের সঙ্গেও কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছেই, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে। এহেন পরিস্থিতিতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (আগ্রহী) অধীনে সিবিএইচই ইন্সটিটিউট অনুমোদন প্রদানই হতে পারে এই সমাস্যার যৌক্তিক সমাধান। এজন্য সিবিএইচই প্রবিধানের সামান্য সংশোধন করতে হবে। এ ব্যবস্থায় বিদ্যমান সিবিএইচই প্রোভাইডার্স বা নতুন সিবিএইচই উদ্যোক্তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিবিএইচই ইন্সটিটিউট স্থাপন ও পরিচালনা করবেন। এসব ইন্সটিটিউট “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এক্ট ২০১০” পরিপূর্ন আইন ও বিধি মেনে চলবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সামনে সিবিএইচই ছাড়াও ভিন্ন কিছু বাতায়ন উন্মুক্ত হবে।

 

n লেখক :গ্রুপ সিইও, ড্যাফোডিল ফ্যামিলি