আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার। এই স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর আরম্ভ হওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ জন ভূমিহীদেরকে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি গৃহ নির্মাণ করে জমিসহ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প। মুজিববর্ষে লক্ষাধিক গৃহহীনের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। একত্রে বিপুল পরিমাণে গৃহ নির্মিত হয়েছে যা বিশ্বে অন্যন্য নজির স্থাপন করেছে। প্রকল্পটি দেশ বিদেশে বেশ সুনাম অর্জন করলেও দুর্নীতিবাজদের অনিয়মের কারণে তা কেনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠেছে।
সম্প্রতি দেশের ২২ জেলায় ৩৬টি উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ভূমিহীনদের গৃহ নির্মাণ নিয়ে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা যায়, গৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে নীতিমালা মানা হয়নি। গৃহ নির্মাণে ব্যবহূত মালামালও ছিল নিম্নমানের। অনেকে গৃহ নির্মাণে ত্রুটি থাকায় দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, অনেক দেয়াল ধসে পড়েছে। গুণগত মান সঠিক না হওয়ায় পিলার ভেঙ্গে গিয়েছে। অনেক স্থানে মাটি ধসে গিয়ে গৃহ ভেঙ্গে গেছে। এই প্রকল্পে অনিয়মের কারণে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সরকার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের গৃহ নির্মাণের অনিয়ম, অবহেলা ও অর্থ আত্মসাত্কারিদের ব্যাপারে কঠোর নীতিতে এগুচ্ছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবহেলায় জড়িত সংশ্লিদের বিরুদ্ধে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, আবার অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যেসব গৃহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো পুননির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সরকারের চলমান ছয়টি উন্নয়ন প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সন্ধান পেয়েছে। ২০১৮ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় দেড় হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল। এদেশে প্রকল্প মানেই যেন কতেক মানুষের সম্পদ গ্রাসের মাধ্যম। দুর্নীতির কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হয়, আর বিলম্বিত হলেই প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায়। নির্মাণকাজে বা প্রকল্প সম্পন্ন করতে যে দুর্নীতি করা হয়, তার ক্ষতি ভয়াবহ। দেশের রাস্তাঘাট, উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ হওয়ার কথা ছিল মজবুত, টেকসই, কিন্তু উইপোকাদের লাগামহীন দুর্নীতির কারণে এক বর্ষার পানিতেই সব বিনষ্ট হয়ে যায়। আর এসব প্রকল্পের শত কোটি টাকা উইপোকাদের পেটে যায়। ফলে উন্নয়নের চাকা সঠিকভাবে ঘুরতে পারছে না। উন্নয়নের সুফল খেয়ে ফেলছে উইপোকারা। দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। ইতিপূর্বে সরকারি কর্মকর্তাদের বালিশকান্ড, পর্দা কান্ড, করোনাকালিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেলাঙ্কারি, ক্যাসিনা কান্ড, পাপিয়া কান্ড, ব্যবসায়ী মুনাফাখোরি সিন্ডিকেটের পিয়াজ, চাল কেলাঙ্কারি, লুটেরাদের শেয়ার বাজার, ব্যাংকের টাকা লোপাট, মাদক ও চোরাচালান কারবারিদের কান্ড জাতি দেখেছে। দুর্নীতির দাবানলে যুক্ত হয়েছে বিদেশে টাকা পাচার। ঋণখেলাপ আমাদের অর্থনীতিকে উইপোকার মতোই ঝাঁঝরা বানিয়ে ফেলেছে। দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই টাকায় যদি প্রকৃতভাবে বিনিয়োগ হতো দেশে উত্পাদন বৃদ্ধি পেতো এবং দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান হতো। সংঘবদ্ধ একটি চক্র সুকৌশলে লুট করছে ব্যাংকের টাকা, আর তা বিদেশে পাচার করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়ি চালক দেড় হাজার কোটি টাকা নিয়ে পরিবার নিয়ে অষ্ট্রেলিয়া পাড়ি জমিয়েছেন। প্রশান্ত হালদারসহ আরা অনেকে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। তাঁরা কানাডা সহ বিভিন্ন উন্নত দেশে আলিশান বাড়ি, গাড়ি কিনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনে রেকর্ড বিষ্ময়কর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে অজস্র উন্নয়ন দিয়ে যাচ্ছেন। সে উন্নয়নের বরাদ্দ লুটপাটের দুঃসাহস দেখাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতিবাজ উইপোকারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অর্থ লুটে নিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু এদের নাম দিয়েছিলেন চাটার দল। তিনি এদের সম্পর্কে দেশবাসীকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি, মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণু ঘোষণা করেছিলেন। তখন তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, অপরাধী যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দল, আত্মীয় স্বজন পরিবারের কাউকে ছাড় না দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন। দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠনকারিরা দেশ ও জনগণের শত্রু, এটি যেমন বঙ্গবন্ধু রুখে দাঁড়াতে বলেছিলেন, তেমনি শেখ হাসিনাও বারবার বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা ও দলীয় এমপিদের এমনকি আত্মীয় স্বজনকে পর্যন্ত বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। প্রধানমন্ত্রী যেখানে দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখছেন সেখানে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন। সরকার ও দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা উইপোকার দল সরকারের সকল অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। তাই দেশবাসী মনে করেন, অচিরে দেশব্যাপী আরেকটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। যে অভিযান ইতিপূর্বে শেখ হাসিনা পরিচালনা করেছেন।
দেশের উন্নয়নের চাকা আরো গতিশীল থাকত, যদি দুর্নীতির পিঁপড়া উন্নয়নের গুড় না খেত। দুর্নীতির ব্যাপকতা, মাত্রা, ক্ষেত্র ও কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষত ব্যাংকিং খাতে প্রায়শই নতুন ও প্রায় অবিশ্বাস্য দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ হচ্ছে। দুর্নীতি উইপোকার মতোই দেশের উন্নতি ও প্রগতিকে ধ্বংস করে। সংবিধান অনুসারে দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান অধিকারপ্রাপ্ত। কারো প্রতি ভয় বা অনুরাগ প্রদর্শন না করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। আসুন দুর্নীতিকে সমুলে উত্পাটন করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাঙলা গড়ে তুলি।
n লেখক : রাজনীতিক