‘বিধিমালার ব্যত্যয়ে কোনো ভবনই ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে না’
ইত্তেফাক রিপোর্ট
শিল্পকারখানা নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও ফায়ার কোড অনুসরণ না করা, রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার নির্দেশিত ভূমি ব্যবহার প্রস্তাবনার সুস্পষ্ট ব্যত্যয়, ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধিমালাসমূহের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অগ্নি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব, কারখানা তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের প্রকৃত নজরদারির অভাব—প্রভৃতি অনুষঙ্গসমূহ নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ। যাকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করা যায়। গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের উদ্যোগে অনলাইনে আয়োজিত ‘নারায়ণগঞ্জের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের দায় ও করণীয়’ শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপে বক্তারা এ সব কথা বলেন।
সংলাপে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহমেদ, সাবেক শ্রম সচিব মিকাইল শিপার, ইউএনডিপি বাংলাদেশের ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট এবং ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন বিশেষজ্ঞ মো. আনিসুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আশিকুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মঈনুল ইসলাম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক প্রণীত ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম, শিল্প স্থাপনা নকশাবিদ স্থপতি মোহাম্মদ আমিমুল এহসান, বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম এবং যুগ্ম-সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ রাসেল কবীর প্রমুখ। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সঞ্চালনায় পরিকল্পনা সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ।
মূল বক্তব্যে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবন নির্মাণে ত্রুটি এবং নির্মাণ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত আদর্শ মান অনুসরণ না করা হলে এবং বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটলে, কোনো ভবনই ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে না। নারয়ণগঞ্জের হাশেম ফুড কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তার আধুনিক কোনো ব্যবস্থাপনাই ছিল না। ড. আদিল আরো বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অধিকাংশ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকায় ন্যূনতম অবকাঠামো নিয়ে গড়ে উঠা এ সব কারখানা মৃত্যুকূপ হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
নারায়ণগঞ্জের কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ থেকে পরিলক্ষিত হয়, জরুরি বহির্গমনের জন্য বিল্ডিং কোড অনুযায়ী যেভাবে সিঁড়ি রাখার দরকার ছিল, তা এখানে ছিল না। নারায়ণগঞ্জের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কারখানার অভ্যন্তরীণ অগ্নি মোকাবিলার প্রস্তুতির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও আইনের শাসনের অভাবই প্রধানত দায়ী। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্পকারখানায় ফায়ার এলার্ম, ফায়ার এস্টিংগুইশার, ফায়ার স্প্রিংকলার, স্মোক ও হিট ডিটেকশন, ফায়ার ডোর, ফায়ার লিফট, কম্পার্টমেন্টালাইজেশন, ভবনের আয়তন ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্তসংখ্যক সিঁড়ি, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, ফায়ার লিফট, পর্যাপ্ত বারান্দা, ভবনের অভ্যন্তরে আলো ও বায়ু প্রবাহের অভিগম্যতা, ভবনের মধ্যবর্তী পর্যাপ্ত দূরত্ব, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ, ফায়ার হাইড্রেন্ট, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, ওয়েট রাইজার, আগুন, তাপ ও ধোঁয়া মুক্ত এলাকা, ইমারজেন্সি লাইট এবং আধুনিক ফায়ার ফাইটিং উপকরণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন অধ্যাপক আদিল।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে বলেন, বিল্ডিং কোড, ফায়ার কোড এবং পরিকল্পনার অনুসরণ ছাড়া কোনো ভবন তৈরি করা হলে তার ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক জায়গায় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করলেও ফায়ার কোড অনুসরণ করা হয় না, যার ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় রাস্তা না থাকার জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। গার্মেন্টসের পাশাপাশি, দেশে যে সব প্লাস্টিক, খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রকার কারখানা রয়েছে সেখানে বিল্ডিং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং সেই সঙ্গে জবাবদিহিতা ও নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে এসব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে।