কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) বিশ্ব জুড়েই স্বীকৃত কর্মসূচি। সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকগুলোকে এখাতে ব্যয় করতে বলা হয়েছে। এ কারণে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ কিংবা সংগঠনকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন ব্যাংকে সিএসআর তহবিল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এই সিএসআরের টাকা পরিচালকদের অনেকে নিজেদের ইচ্ছা মতো খরচ করেন। প্রভাবশালীদের খুশি করতে, ক্ষমতাধর কারো বইয়ের প্রকাশককে কোটি কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সংগঠন খাতে নামমাত্র টাকা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো পরিচালক নিজ এলাকায় নির্বাচন করার আগে ব্যাংকের সিএসআরের টাকা ব্যয় করেছেন বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র।
সূত্রমতে, চেয়ারম্যান-পরিচালকদের ‘ভাগাভাগি’ দেখে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিজের লোকদের সন্তুষ্ট করতে পিছপা হন না। সিএসআরের ব্যয় নিয়ে এক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও একজন সাবেক মন্ত্রীর পালটাপালটি বক্তব্যও শোনা গেছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিএসআর নীতিমালা পরিবর্তন করেছে। অতি সম্প্রতি নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, পরিচালকরা ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি সিএসআরের টাকাতেও ভাগ বসাচ্ছেন। নিজেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে সিএসআরের টাকা নিয়ে নিচ্ছেন। আর ব্যাংক সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজ পেতে ভেন্ডর ও থার্ড পার্টি হিসেবে একাধিক কোম্পানি খুলেছেন অনেকে।
রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এমন পরিচালকদের কেউ কেউ ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নিজ এলাকায় রাজনীতি করেন। সরকারি ব্যাংকের এক নারী পরিচালক তার এলাকায় সেলাই মেশিনসহ ব্যাংকের অর্থে প্রচারকাজ চালিয়েছেন। বেসরকারি কোনো কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকরা সংগঠনের নামে তোলা সিএসআরের টাকায় গাড়ি কিনে নিজের কিংবা পরিবারের বা ব্যাবসায়িক কাজে ব্যবহার করছেন বলেও সূত্র জানায়। পাশাপাশি চেয়ারম্যান-পরিচালকদের নানা ভাতা ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়। প্রমোদ ভাতায় ব্যয় করা হয় সিএসআরের অর্থ। ফলে সিএসআর তহবিল যে লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সিংহভাগই চলে যাচ্ছে ভিন্ন খাতে।
এদিকে ব্যাংকে নারী কর্মীরা প্রায়শই নিগৃহীত হয়ে থাকেন। যোগ্যতা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত হন অনেকে। শাখা পর্যায় থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত নানাভাবে নারী কর্মীদের হেনস্তা করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। এক ব্যাংকের একজন নারী কর্মী ম্যানেজারের মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন। কোনো কোনো ব্যাংক রয়েছে যেখানে চেয়ারম্যান কিংবা এমডি বা ঊর্ধ্বতন মানবসম্পদ কর্মকর্তাকে ‘খুশি’ করতে না পারলে পদোন্নতিও হয় না। স্বামী-সংসার সামলে নারী কর্মীরা কাজ করেন। তবু নির্দিষ্ট সময়েরও বেশি সময় তাদের বাড়তি কাজ দিয়ে আটকে রাখা হয়। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হলেও পরদিন ঠিকই নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাংকে ঢুকতে হয়। নারী কর্মীরা পুরুষের সমান তালে কাজ করলেও পদোন্নতির বেলায় পিছিয়ে থাকেন। ক্যাশ বিভাগের কর্মীরা তো আরো বিপাকে। হিসাব না মিললে নিজের টাকা দিয়ে ব্যাংকের হিসাব মিলিয়ে দিতে হয়। কাউকে কিছু বলতে পারেন না। বরং নীরবে সব সইতে হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখনো ব্যবস্থাপনার উচ্চপর্যায়ে নারীর সংখ্যা হাতেগোনা। ব্যাংক সূত্রগুলো বলেছে, ব্যাংকিং খাতের এ ধরনের অনিয়ম দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর দৃঢ়তা দরকার।