দলের ভূমিধস বিজয়ের পরও শান্তিতে নেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি নিজে নন্দীগ্রামে পরাজিত হয়েছেন। ফলে মমতা আপাতত ছয় মাসের জন্য মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে পারলেও নিয়মানুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে তাকে বিধানসভার সদস্য হয়ে আসতেই হবে। আর এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে তৃণমূল কংগ্রেস।
নির্বাচনের আগে বিজেপি ধারণা করেছিল, এবার তারা পশ্চিমবঙ্গকে দখলে নেবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি নিজে হারলেও তার দলকে বিপুল ম্যান্ডেটে জয় এনে দিয়েছেন। সুতরাং বিদ্বজ্জনেরা মনে করছেন, মমতাকে এত সহজে মুখ্যমন্ত্রী পদে শাসন করার সুযোগ কিছুতেই দেবে না বিজেপি। পদে পদে তারা নিয়মের প্যাঁচের মধ্যে ফেলে মমতাকে নাকানি-চুবানি খাওয়াবেই। তারই ইঙ্গিত এখন নতুন করে দেখতে পাচ্ছেন অনেকে। কিছুদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, উপনির্বাচনের জন্য প্রচারে মাত্র সাত দিন সময় দিলেই চলবে। এদিকে করোনা পরিস্থিতিও পশ্চিমবঙ্গে উন্নতির দিকে। সুতরাং তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, উপনির্বাচন হওয়ার এখনই ভালো সময়। সেই কথা বলতেই আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) উপনির্বাচনের দাবি জানাতে দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছে তৃণমূলের একটি প্রতিনিধিদল। গত ৫ জুন শপথ নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা, সুতরাং তার কাছে সময় রয়েছে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই মমতার জন্য কলকাতার ভবানীপুরের আসন ছেড়ে দিয়েছেন তৃণমূলের বিধায়ক শোভনদেব চ্যাটার্জি। তৃণমূল মনে করছে, উপনির্বাচনে মমতা ভবানীপুর আসন থেকে নিশ্চিতভাবে বিজয়ী হবেন। ভবানীপুর ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে আরো ছয়টি কেন্দ্রে উপনির্বাচন বাকি রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে খড়দহ, গোসাবা, জঙ্গিপুর, সামসেরগঞ্জ, শান্তিপুর ও দিনহাটা।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও এখনো একাধিক রজ্যে বিধানসভা ও লোকসভার উপনির্বাচন বাকি আছে। কিন্তু দেশের করোনা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কোনো রাজ্যেই উপনির্বাচন করায়নি নির্বাচন কমিশন। ভারতের জনপ্রতিনিধি আইন অনুসারে বিধানসভার কোনো আসন খালি হলে তার ছয় মাসের মধ্যে উপনির্বাচন করাতে হয় নির্বাচন কমিশনকে। তবে সেই পদের মেয়াদ যদি এক বছর বা তার কম হয়, তাহলে সেই বাধ্যবাধকতা নেই। অথবা নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকার যদি মনে করে পরিস্থিতি ভোট করানোর মতো নয়, তাহলেও উপনির্বাচন না-করানো যেতে পারে। এর উদাহরণ ইতিমধ্যে ভারতের অন্য রাজ্যে দেখা গেছে। সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তিরথ সিং রাওয়াত পদত্যাগ করেছেন। বিজেপির তরফ থেকে বলা হচ্ছে, রাওয়াত লোকসভার সদস্য ছিলেন। তাকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিধানসভার সদস্য হতে হতো। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখনো উপনির্বাচন করানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই রাওয়াত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আর এখানেই পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচনের সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে এখনো করোনার কড়াকড়ি পুরোপুরি ওঠেনি। আগের থেকে পরিস্থিতি ভালো হলেও করোনার প্রকোপ এখনো আছে। বর্তমানে উত্তরখণ্ডে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১০০-র নিচে, মারাও যাচ্ছেন মাত্র দু-এক জন করে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণে এলেও উত্তরখণ্ডের মতো অত ভালো নয়। যেখানে উত্তরখণ্ডের করোনা পরিস্থিতি অনেক ভালো থাকা সত্ত্বেও করোনার কারণেই সেখানে নির্বাচন কমিশন এখনো উপনির্বাচনের উদ্যোগ নেয়নি, সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে এখনই নির্বাচন করার কথা ভাবাটা দুরাশা।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ আগেই সাবধান করে দিয়েছেন যে, ভারতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। সেটা সত্যি হলে তখন তো উপনির্বাচনের কোনো প্রশ্নই নেই। ফলে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ আরো ঘন হচ্ছে। এখন, যদি নভেম্বরের আগে উপনির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ নভেম্বরের আগেই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে মমতাকে সরে যেতেই হবে। কারণ, ইতিমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০১ সালে এস আর চৌধুরী বনাম পাঞ্জাব সরকার মামলায় রায়ে বলেছেন, একবার ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে, তারপর আর না জিতে এসে মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যাবে না। ভারতের তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা ও পাঞ্জাবের একটি মামলার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য ছিল, ছয় মাসের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তারপর বিধায়ক নির্বাচিত না হয়েই পদত্যাগ করে এক দিন পরেই আবার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন, এমন ঘটলে সংবিধানের ধারার যে আদর্শ, তা ব্যর্থ হয়। তাই সেটা করা যাবে না। এজন্য শীর্ষ আদালত বলেছিল, প্রথম ছয় মাসের জন্যই নির্বাচিত না হয়েও মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী থাকা যাবে মাত্র একবারই। সুতরাং মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে হলে মমতার জন্য নভেম্বরের আগে উপনির্বাচন হতেই হবে।
এদিকে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে বিজেপির বিধায়ক পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের বলেছেন যে, করোনার টিকাকরণ সম্পূর্ণ না হলে বিজেপি উপনির্বাচনের পক্ষপাতী নয়। এসবের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে দানা বেঁধেছে বঙ্গভঙ্গের আশঙ্কা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারার পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু নেতা পশ্চিমবঙ্গকে ভেঙে একাধিক রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি করার দাবি তুলেছেন। এই ধরনের তিনটি দাবি উঠেছে। দাবির প্রথমটি করেছেন উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রের এমপি জন বার্লা। তিনি ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বার বলেছেন যে, উত্তরবঙ্গের অনুন্নয়ন দূর করতে নতুন রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রয়োজন। বিষ্ণুপুরের সাংসদ সৌমিত্র খান দাবি তুলেছেন, জঙ্গলমহালসহ আদিবাসী-অধ্যুষিত রাঢ় বাংলার জেলাগুলো নিয়ে পৃথক রাজ্য গড়া হোক। এদিকে যারা নতুন করে বঙ্গভঙ্গের কথা বলছেন, সেই জন বার্লা ও নিশীথ প্রামাণিককে নরেন্দ্র মোদির সরকার সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করেছে। এতে করে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এদের মন্ত্রিত্ব কি পশ্চিমবঙ্গ ভাগের দাবি তোলার পুরস্কার হিসেবে এসেছে? তৃণমূলের আশঙ্কা, যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ দখলে বিজেপি ব্যর্থ হয়েছে, তাই এবার তারা পশ্চিমবঙ্গ ভাগ করতে উদ্যোগী হতে পারে। যদিও বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ ভাগের বিরুদ্ধে। এটাই দলের অবস্থান।
তবে পশ্চিমবঙ্গ ভাগ করার বিষয়টি একদম নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থি ‘গণশক্তি’ পত্রিকার মতে, ১৯৯৮ সালে উত্তরবঙ্গের মধ্যে প্রথম ধূপগুড়ি থেকে কামতাপুর আন্দোলন শুরু করে বাংলা ভাগের চক্রান্ত শুরু হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০০২ সালের আগস্ট পর্যন্ত কেএলও জঙ্গিবাহিনী পৃথক রাজ্যের দাবিতে হিংসাত্মক হামলা অপহরণ শুরু করে। শুধু ধূপগুড়িতেই ১০ জন নিহত হন। তৃণমূলের নেতারা মনে করেন, তাদের নেত্রী মমতা ছাড়া অন্য কেউ রাজ্য ভাগ আটকাতে পারবে না। সেজন্য ২০২৪ সালে মমতাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করতে হবে।
এদিকে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা গতকাল বুধবার তাদের সম্পাদকীয় কলামে বলেছে, ‘...নির্বাচনী পরাজয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক খেলা খেলিতে চাহে বিজেপি, বাংলাভাগের প্রস্তাব হইতে শুরু করিয়া মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাস পর্যন্ত ঘটনাসমূহ তলাইয়া দেখিলে বুঝিতে বিলম্ব হয় না। অন্যান্য অবিজেপি-শাসিত রাজ্যেও (যেমন তামিলনাড়ু) একই ধরনের কাণ্ড ঘটিতেছে।’ বিদ্বজ্জনদের মতে, নতুন এই বাংলাভাগ ছকের পেছনে কারণটিও স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলো ইতিমধ্যেই বিজেপির ঘাঁটিতে পরিণত। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং, কালিম্পং ও জলপাইগুড়ি—এই পাঁচটি জেলায় বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভাগ্যে ৭৮ শতাংশ বিধায়ক জুটিয়েছে। কিন্তু এসব জেলার জনসংখ্যা কম হওয়ায় বিজেপির পক্ষে সামগ্রিকভাবে রাজ্যে সুবিধাজনক অবস্থায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না—বাংলা ভাগ করে একটি নতুন প্রদেশ তৈরি করা গেলে সেটা বিজেপি শাসন করতে পারবে। কেউ কেউ আবার বলছেন, বিশ্বে ভূরাজনীতির পরিবর্তন ঘটছে, এশিয়াও প্রভাবিত হচ্ছে, বিশেষত বাংলায়, যেখানে ঠিক মাথার ওপরে রয়েছে চীন। পশ্চিমবঙ্গের দখলে রয়েছে ‘চিকেনস নেক করিডর’—নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০ কিলোমিটারের একফালি জমি, যা অবরুদ্ধ হলে উত্তরবঙ্গ ও কলকাতা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। চীন আক্রমণ করলে এবং করিডর বিচ্ছিন্ন হলে অবস্থা সামাল দেওয়া মুশকিল হবে। এজন্য এই ‘চিকেনস নেক করিডর’ এটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলে ভারতের সুবিধা হবে বলে মনে করেন ভারতের কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
সব মিলিয়ে বলা যায় উপনির্বাচন ও বঙ্গভাগ নিয়ে মমতা ব্যানার্জি বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। চাপের মধ্যে রয়েছে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গই। এজন্য আগামী কয়েকটি মাস এবং ২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
n লেখক :