নিরাপদ উত্পাদনব্যবস্থা

কয়েক বছর আগে ঢাকার আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের মনে আছে। এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিরূপণ এবং দোষীদের শনাক্ত করতে একাধিক সংস্থা তদন্ত করেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি যথা সময়ে তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। রিপোর্টে ঘটনাটি নাশকতা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের জন্য মালিক-কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে দায়ী করা হয়ছিল। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের সুপারিশও করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে পাঁচটি চূড়ান্ত ও ১৫টি সাধারণ সুপারিশ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর হতাহতের দায় স্বীকার করেছিল বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বিজিএমইএ। এ জন্য বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ জাতির কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রতিটি পরিবারকে ৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ স্বীকার করেছেন, অনেক গার্মেন্টস মালিকই কারখানা করার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাহ্য করেন। অথচ প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই দেশের শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ, সরকারের তদন্ত কমিটি, মিডিয়া গত ২০ বছর ধরে এ কথা বলে আসছে। শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার শ্রম আইন সংশোধন করেছে। গার্মেন্টস কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প সিঁড়ি, নিয়মিত অগ্নিমহড়া, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণসহ নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা যেমন মালিকের দায়িত্ব, তেমনি এর বাস্তবায়ন মনিটরিং করাও বিজিএমইএ ও শ্রম অধিদপ্তরের দায়িত্ব। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে জেল-জরিমানাসহ শাস্তির বিধানও আছে। বিগত এক দশক ধরে বিদেশি ক্রেতারাও কারখানার পরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তাজনিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি বা কমপ্লায়েন্স প্রতিপালনকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বিজিএমইএ ও সরকারের মনিটারিংও যথাযথভাবে করা হয়নি। দেখা গেছে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই সংশ্লিষ্ট সবাই একটু নড়েচড়ে বসে, দৌড়ঝাঁপ করে। তারপর আবার পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

এবারের রূপগঞ্জের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহল থেকে কিছু বিপত্সংকেত এসেছে। তাছাড়া এই খাতের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি বেশ কিছু সময় থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহত্ শ্রমিক সংগঠন আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বিরুদ্ধে তত্পর রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তারা এর প্রতিকার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে নালিশ করেছে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। তাদের এই দাবির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অব্যাহত সমর্থন জানিয়ে আসছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী পর্যায়েও এ সমস্ত দাবি তারা উত্থাপন করে আসছে। অনেকেই সন্দেহ করছেন, কোনো দেশ হয়তো তাদের এজেন্টদের দিয়ে বিভিন্ন স্থানে কলকারখানায়, বস্তিতে বা বহুতলবিশিষ্ট ভবনে আগুন লাগিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে ঘায়েল করার জন্য আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে। এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতগণ হরহামেশাই শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি তোলেন। এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ পাওয়ার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র সব স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ দিলেও বাংলদেশকে দিতে চায় না। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশের সঙ্গে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে। এএফএল-সিআইও বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস আমদানি বন্ধ করার জন্য আমদানিকারকদের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো এ ব্যাপারে তাদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কয়েক মাস আগে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি বায়ারদের সংগঠনের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার করা হয় যে তারা বাংলাদেশ থেকে আর গার্মেন্টস অর্ডার নেবে না। কারণ এখানে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা হয় না। বিষয়টি সন্দেহজনক এজন্য যে, এর কয়েক দিন পরই ইউরোপ-আমেরিকার বায়াররা ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন যে, তারা আগের চেয়ে বেশি অর্ডার দিতে আগ্রহী। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় তারা গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করবেন। তারপর থেকে গার্মেন্টসে কোনো আন্দোলন হয়নি। এমনকি ঈদের আগে বেতন-ভাতা দিয়ে প্রতি বছরই যে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এবার তাও হয়নি। উত্পাদন ও রপ্তানি নির্বিঘ্নে হয়েছে।

বাংলাদেশ দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হয়ে এলেও বিগত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে বেশ কিছু অনন্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এলে বিশ্ব এখন সেসব অর্জনের কথাও বলে। এর একটি হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে সাফল্য। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৯ সালে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে চীন ও ২৭ দেশের গ্রুপ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক দেশে উন্নীত হয়েছে। পেছনে ফেলেছে তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তানের মতো টেক্সটাইল খাতে শক্তিশালী দেশগুলোকে। দরিদ্র দেশ এত দ্রুত এত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে দেখে অনেকের ঈর্ষা হতে পারে। প্রতিযোগীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারে। অনেক ধরনের শত্রুতা জন্ম দিতে পারে। তাই নাশকতা ও অস্থিরতার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার অসুস্থ কৌশল অনেকে অনুসরণও করতে পারে। এর সঙ্গে দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত থাকতে পারে।

 উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কারখানায়ও আগুন লাগে। কিন্তু জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় সামান্যই। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এর প্রধান কারণ কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার অভাব। এই হতাহতের ঘটনার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পোশাক রপ্তানির ওপর যাতে না পড়ে, সেজন্য বিজিএমইএ অত্যন্ত তত্পর রয়েছে। তবে এখন বিজিএমইএর নেতৃত্বে গার্মেন্টস মালিকদের ভুল শোধরানোর সময়। কারখানায় উন্নত উত্পাদন পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মস্থলে শ্রমিক-কর্মচারীদের সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মপরিবেশের শর্ত মেনে আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করার কাজগুলো দ্রুতই শুরু করতে হবে। ষড়যন্ত্রকারী বা প্রতিযোগীদের পরাজিত করার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো পথ নেই।

বাংলাদেশ আর্থসামাজিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখতে হবে। যে জাতির উন্নতি করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা আছে, তাকে কেউই দাবিয়ে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও তাই বলে। ছোট থেকে বড় হতে হলে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। অনেক বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করতে হয়। এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। আফ্রিকার নাইজেরিয়া, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, এশিয়ার মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের অনেক দেশ উন্নতির পথে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কেউ সাহসিকতার সঙ্গে আবার কেউ কৌশল করে এগিয়ে গেছে। মানসিক দৃঢ়তা ও তত্পরতার অভাবে অনেকে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশকেও বিশ্ব থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সততা বজায় রেখে আন্তরিকতার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বিবেককে জাগ্রত রাখতে হবে। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে নিষ্ঠাবান হতে হবে। কারখানার নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। তবেই অগ্রযাত্রা সুনিশ্চিত হবে। উত্পাদন নির্বিঘ্ন হবে।

n লেখক :সাংবাদিক-কলামিস্ট