কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণে হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বৃদ্ধিতে সৃষ্ট বন্যায় সারা বিশ্বে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রেক্ষাপটে নদীতে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বর্তমানে বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যাপক হারে বাঁধ নির্মাণ হুমকিতে ফেলছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে। কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণে পরিবেশের ওপর সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব পড়ে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটার মাধ্যমে। জল ও পললপ্রবাহ বাঁধ নির্মাণের কারণে নিম্ন স্রোতের দিকে ধাবিত হয় এবং একটি নদীর মোহনাকে ধীরে ধীরে চরাঞ্চলে পরিণত করে। ফলে নদীতে পলির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি ভূপৃষ্ঠে জলাবদ্ধতাও ত্বরান্বিত হয়। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় বৃদ্ধি পায় লবণাক্ততা ও বিভিন্ন ধরনের দূষণ। আবার বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে পুষ্টির বিনিময় বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিলুপ্ত হতে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ। বাঁধগুলোর সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো এটি একটি নদীর গতিশীলতা ও কার্যকারিতা পরিপূর্ণভাবে নষ্ট করে দেয়। বাঁধের কারণে নদীপৃষ্ঠে পলি জালের মতো বিছিয়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড়ি নদীর তলদেশের পাথরগুলো তখন সমাধিস্থ হয়, যা মাটির গঠন প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাঁধের কারণে মাটির গুণমানে এমন পরিবর্তন আসার কারণ পলি ও অন্যান্য পরিপোষক পদার্থ বিভিন্ন কাঠামোতে আটকে যাওয়ায় নদীর পানিতে মিশে ছড়িয়ে যেতে না পারা। আর পলি এক জায়গায় আটকে গেলে নদীর বিশেষ অংশ দিয়ে পানির অতিরিক্ত প্রবাহ নদীপাড়ে ভাঙনকেও ত্বরান্বিত করে। বাঁধের কারণে নদী খণ্ডিত হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর স্থানান্তর বাধাগ্রস্ত হয়। যাদের কারো কারো প্রজনন মৌসুমে বিচরণ করতে হয় গভীর পানির মোহনায়। প্রজননক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অনেক প্রজাতির পরিমাণ এ কারণেই দেশের জলাশয়গুলোতে কমছে নিয়মিত হারে। অনেক প্রজাতি বিলুপ্তও হচ্ছে প্রতি বছর।

উদাহরণ হিসেবে ইউরোপের কিছু দেশ থেকে ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া স্যামন ও স্ট্যারজেন মাছের কথা বলা যেতে পারে। কারণ অনুসন্ধানে পরিবেশবিদেরা লক্ষ করেছেন, যেসব দেশে মাছগুলো হারিয়ে গেছে, সেসব দেশের মাত্র ১ শতাংশ নদী বর্তমানে স্বাধীনভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বাঁধগুলো পানি সঞ্চয় করে নির্দিষ্ট অঞ্চলে চলমান খরা সমস্যায় ত্বরিত আলোর দিশা হিসেবে উদ্ভূত হওয়া, নবায়নযোগ্য শক্তি উত্পাদনের উত্স হওয়া এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে তথাকথিত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে এর পেছনের ব্যাপক অপকারিতাগুলো আপাদমস্তক চাপা পড়ে আছে। যেমন একটি বাঁধ দ্বারা নির্মিত জলাধার প্লাবিত জৈব পদার্থের পচন ঘটিয়ে পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস ছেড়ে দেয়। ফলে জলাধারগুলো একেকটি কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করা শুরু করে। আবার জলাবদ্ধতায় বেশির ভাগ প্রজাতির গাছ মরে যাওয়ায় ঐ অঞ্চলের মুক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য আর কোনো প্রাকৃতিক মাধ্যমও পাওয়া যায় না, যা সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণয়ণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, বাঁধ নির্মাণ ও নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ পরিবর্তনে সৃষ্ট ভোগান্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিশরের নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা জনবসতি। ক্রমবর্ধমান পানির সংকটে তাদের একের পর এক কৃষিজমি মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ঐ অঞ্চলে মৌসুমি ফসল উত্পাদন।

এই সংকটের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে ইথিওপিয়া সরকার কর্তৃক নির্মিত গ্রান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসা ড্যাম প্রজেক্টের আওতায় বাঁধ। বাঁধটির কারণে ইথিওপিয়ান হাইল্যান্ড, সিমিয়েন পর্বতমালা ও ভিক্টোরিয়া লেক থেকে নীল নদে প্রাকৃতিকভাবে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হতো, তা কমেছে বহুগুণে। এছাড়া তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির সংকট ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ভারতের অংশে উজানে অপরিমিতভাবে পানি প্রত্যাহার করায় ভাটিতে তিস্তার পানির প্রবাহ কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। পানির অভাবে সেচ প্রকল্প ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যসংকটের আশঙ্কা যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে তিস্তা অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। তাই নদীর পানির প্রবাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হয় এমন স্থানে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ না করা, বাঁধের কারণে বিঘ্নিত নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে সাপ্লিমেন্টারি প্রবাহপথ উন্মুক্ত রাখা, মৃত ও অর্ধমৃত নদীর পলি নিয়মিত ড্রেজিং করে স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই রক্ষা করা সম্ভব পৃথিবী জুড়ে হুমকিতে পড়া জীববৈচিত্র্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়