করোনা ভাইরাসের হঠাত্ আবির্ভাবের কারণে থমকে গেছে পৃথিবী। ভয়াবহ এই ভাইরাসের আক্রমণে মানুষের জীবনযাত্রা আশঙ্কার মুখোমুখি হওয়ায় হঠাত্ স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে জীবিকা, চিরচেনা কোলাহল থেমে এখন সুনসান নীরবতা। বিশ্বের মানুষ হঠাত্ করেই নতুন ও কঠিন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন। আকস্মিক করোনার ভয়াবহতা, আক্রমণ-আগ্রাসন পৃথিবীর সমগ্র শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিহ্বল করে ফেলেছে। ভাইরাসের আক্রমণ মূলত শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করলেও আমরা অজান্তেই পড়ে যাচ্ছি ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
করোনার কারণে গত দেড় বছর যাবত্ ঘরবন্দি সবাই। যেখানে দিনের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা, কর্মজীবীদের কর্মস্থলে থাকার কথা, শিশুদের হইচই-খেলাধুলা করার কথা, সেখানে সবাই গৃহবন্দি। সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গৃহবন্দি এই নতুন জীবনে অনেকের মধ্যেই মানসিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। এক জরিপে দেখা গেছে, করোনায় মৃত্যুর চাইতে আত্মহত্যার সংখ্যা অধিক! এজন্য আত্মহত্যাকে নীরব মহামারি হিসেবে গণ্য করা হয়। আত্মহত্যার দিক দিয়ে ইউরোপ সবচেয়ে এগিয়ে। শুধু উন্নত জীবনযাত্রার মান যে মানুষের জীবনে শান্তি এনে দেয় না, এ তথ্যই তার প্রমাণ। হতাশা-আত্মহত্যার মাধ্যমে সমাজের এই ধস নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন মানসিক স্থিরতা। প্রত্যেককেই মানসিক চাপ সহ্য করার কৌশল জানতে হবে, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতে হবে।
কারণ, মন মানুষের শক্তির উত্স। যে কোনো মানুষ তার নিজের সত্তাকে জাগিয়ে তোলা বা ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। মন ও চিন্তাকে বশীভূত করতে পারলেই আমরা নিজেদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি। মানুষের মন মূলত বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এটা বিশ্বাস করতে হবে যে আমি ভালো আছি, আমি আমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, আমি চাইলেই সবকিছু অর্জন করা সম্ভব। মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু উপায় রয়েছে। এর মধ্যে মেডিটেশন, ব্যায়াম, প্রার্থনা, সুস্থ বিনোদন, ইতিবাচক ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনার অভ্যাস করা উল্লেখযোগ্য।
মনকে অস্থিরতা থেকে বাঁচাতে মেডিটেশন দারুণ ভূমিকা রাখে। মেডিটেশনকে বলা হয় সঠিক পদ্ধতিতে বেঁচে থাকার রাস্তা। তাই মানুষের মানসিক অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসতে এই রাস্তা বেছে নেওয়া যেতে পারে। মেডিটেশন এমন এক ধরনের ক্রিয়া, যার দ্বারা কোনো ব্যক্তি তার মনকে একটি চেতনা বা বিশেষ অবস্থায় আনার চেষ্টা করে থাকে। মেডিটেশনের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনে সুখ শান্তি আনার চেষ্টা করা এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করা। মেডিটেশনের ফলে মস্তিষ্ক স্থির ও শান্ত হয়। অন্যদিকে সৃষ্টিকর্তার ওপর আন্তরিক ও বাস্তবিক ধ্যান শরীর ও মনের ওপর আরোগ্যকর উপাদান হিসেবে কাজ করে। আসলে ধর্ম আমাদের চিন্তা-চেতনায় দারুণ প্রভাব ফেলে, নিয়মিত প্রার্থনা মানসিক প্রশান্তি আনে। মনোবল বৃদ্ধি করে। ব্যায়াম ও বিভিন্ন শারীরিক কসরত শরীর ও মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাড়িয়ে তোলে। ব্যায়াম করার ফলে দেহ-মনের জড়তা কাটিয়ে নিমেষেই মন ভালো হয়ে যেতে পারে। পছন্দের গান, চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে মানুষের মনকে ভালো করে তোলে। মানসিক অস্থিরতায় সবচেয়ে প্রিয় গান শুনলে মন ভিন্নভাবে প্ররোচিত হয়, মন ভালো হয়ে যায়। নেতিবাচক চিন্তা আপনাকে দুঃখের অতলে ডুবিয়ে দিতে যথেষ্ট। নেতিবাচক চিন্তায় আপনার মন হতে পারে আপনার শত্রু। তাই নিজেকে ভালোবেসে ইতিবাচক চিন্তায় নিজেকে জাগিয়ে তুলতে হবে। অটোসাজেশন আপনার অবচেতন মনে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। কম ঘুম বা ঘুমের ব্যাঘাত মেজাজ খিটখিটে হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই শরীর ও মন ভালো রাখতে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই।
আমাদের নিজের জীবন ও আশপাশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। আমরা যখন নিজের জীবনের প্রতি সন্তুষ্ট থাকব, তখন মানসিকভাবে সুস্থ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারব। পরিবার, প্রতিবেশী মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ফলে মন সন্তুষ্ট হবে, যা মানসিক শান্তি ও স্থিরতা দিতে পারে। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা মানুষের নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে নষ্ট করে। ধীরে ধীরে এসব অভ্যাস আয়ত্ত করতে হবে, অনুশীলন করতে হবে; যার ফলে মন সুস্থির, নিজের আয়ত্তে আসতে পারে। সর্বোপরি নিজেকে ভালোবাসতে হবে, নিজের শরীর ও মনকে প্রাধান্য দিতে হবে, যে কোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তবেই এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মনোবল অটুট রাখা সম্ভব হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়