সন্তানের মনস্তত্ত্বে পিতা-মাতার প্রভাব

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই খুব যত্নে বড় করে তোলায় ভূমিকা পালন করেন মা-বাবা। তাদের ওপর ভার থাকে পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিকীকরণ, মানসিকতার বিকাশ ও উন্নয়ন, ভুল-সঠিক নির্বাচন করতে সাহায্য করার। তাই মা-বাবার মানসিকতা, তাদের আচার-ব্যবহার একটি শিশুর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। জেনেটিক কারণে চেহারা, শারীরিক গঠন, বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হলেও তাদের মনস্তাত্ত্বিক অগ্রগতি নির্ভর করে তার সঙ্গে তার বাবা-মায়ের সম্পর্কের গভীরতার ওপর। তাদের স্বভাব ও চলাফেরার ওপর।

যে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি একটি শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে তা হলো তার বাবা-মায়ের আর্থসামাজিক অবস্থা, আগাম পিতামাতা-সংক্রান্ত আলোচনা (প্রি প্যারেন্টাল কাউনসিল, যা সচেতন ভবিষ্যত্ বাবা-মা প্রেগন্যান্সির সময় বা তার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিয়ে থাকেন) এবং একটি শিশুর আকস্মিক ব্যবহার ও মেজাজকে মা-বাবা কীভাবে বা কেমন আচরণ ও কৌশলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন।

সমাজে বাবা-মায়ের আর্থসামাজিক অবস্থা একটি শিশু ও তার মা-বাবা উভয়ের ওপরই কম-বেশি প্রভাব ফেলে। তাই অবস্থানভেদে এবং স্থান-কাল-পাত্রভেদে মানসিকতাও কিছুটা আলাদা হতে দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে তাই যারা খানিকটা অর্থকষ্টের শিকার হন, তারা খুব সহজেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কষ্টকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এই মানসিকতার প্রভাব তার বা তাদের ছেলেমেয়ের ওপর পড়ে, এমনকি তারা না চাইলেও। যেখানে একটু সচ্ছল পরিবার শিশুকে আরো সুস্থ পরিবেশ পেতে সাহায্য করে। প্যারেন্টাল কাউন্সিল আজকাল খুব জনপ্রিয় না হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মা-বাবা পরামর্শ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তারা তুলনামূলক ভালো ফল পান পরবর্তী প্রজন্ম লালন-পালনে। কারণ তারা তাদের মানসিকতা কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যান, যা পরবর্তী সময়ে সাহায্য করে। অহেতুক চাপের সম্মুখীন হতে হয় না শিশুদেরও। অনেক সময়ই দেখা যায় কোনো কিছু নিয়ে ক্রোধ প্রকাশ করে ফেলে বাচ্চারা। বদমেজাজ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে মা-বাবা হিসেবে যথেষ্ট ধৈর্য ধারণ করতে হয়। উচ্চ স্বরে কথা বলা বা ধমক দিয়ে কথা না বলে কাছে ডেকে বসিয়ে কথা বললে সেটা শিশুমনে গেঁথে থাকে। তারাও ভবিষ্যতে সহনশীল মনোভাবের পরিচয় দিতে পারে।

আরেকটি বিষয় যা বেশ চোখে পড়ে তা হলো সামাজিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিশুর মেধা যাচাই করার প্রবণতা। কোনো বাবা-মা যখন সমাজের তথাকথিত মূল্যবান কিছু কাজ দেখে তাদের সন্তানকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন, তখন শিশুর মনেও বদ্ধমূল ধারণার জন্ম নিতে পারে। তখন সে সেই নির্দিষ্ট কিছু কাজ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে মনোনিবেশ করাকে অবাঞ্ছিত মনে করে, বিশেষ ক্ষেত্রে অসম্মানও করে ফেলে। কিন্তু মা-বাবা যখন মুক্তচিন্তার চর্চা করেন, তখন সেই পরিবারে শিশুর মন ও মেধা বহুগুণ কর্মশক্তিসম্পন্ন হতে পারে। এর ফলে সমাজের সব কাজই যে গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অপরের পরিপূরক, এই শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। মা-বাবা সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ । তাদের সব অভ্যাসের ছায়া সন্তানের মধ্যে দেখা যায়। তাই তাদের মানসিকতাও সব থেকে বেশি প্রভাব ফেলে সন্তানদের ওপর। 

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়