ভাড়া করা গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্টিকার, তিন দিনের রিমান্ডে প্রতারক
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির মুখ্য পরামর্শক ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা পরিচয়ে কাজ ও সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করে আসছিলেন কথিত ড. এম এম বোরহান উদ্দিন ইমরান নামের এক ব্যক্তি। যদিও তিনি কখনোই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেননি। ইতিমধ্যে তিনি তার আইনজীবী স্ত্রীর সহায়তায় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। অবশেষে ভুক্তভোগীর মামলার ভিত্তিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির হাতে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে সিআইডি। গতকাল বুধবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি (ঢাকা-মেট্রো) শেখ ওমর ফারুক। তিনি জানান, মঙ্গলবার সিআইডির ঢাকা-মেট্রো দক্ষিণের একটি দল ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কের ২৪ নম্বর বাড়ির ৫/ডি নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ইমরানকে গ্রেফতার করে। ইমরান ঐ ফ্ল্যাটে অবসরপ্রাপ্ত সচিব পরিচয়ে বসবাস করতেন। ইমরানের স্ত্রী আমাতুল করিম সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। প্রতারণার বিষয়ে তদন্তে তার স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা মিললে তাকেও আটক করা হবে। অভিযুক্ত ইমরানের বিরুদ্ধে গত ৫ জুলাই ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন আবু সাঈদ নামে এক ভুক্তভোগী। এছাড়াও আরো কয়েক জন অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন সিআইডির কার্যালয়ে।
ভুক্তভোগী আবু সাঈদ জানান, ‘২০১৯ সালে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ইমরানের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি সরকারি কর্মকর্তা, সচিব ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় দিয়ে আমার ছেলেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানোর কথা বলে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে আমি তাকে ৪০ লাখ ৩১ হাজার টাকা দেই। কিন্তু তিনি আমার ছেলেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হন। আমি তার কাছে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে তা দিতে তিনি নানা ধরনের টালবাহানা শুরু করেন।
অপর ভুক্তভোগী মিঠুন চক্রবর্তী জানান, তিনি একটি বিদেশি বিমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার সঙ্গে গোলাম মোস্তফা নামের এক ব্যক্তিও চাকরি করতেন। ঐ বিমা কোম্পানিতে গিয়ে বোরহান উদ্দিন ইমরান নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরামশর্ক পরিচয় দিয়ে ১ কোটি টাকার পলিসি খোলার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে ইমরানের সঙ্গে আমার সহকর্মী গোলাম মোস্তফার মাধ্যমে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনে ডাটা অ্যান্টি অপারেটরের চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। আমি তাকে নগদ ১ লাখ টাকা দেই। বাকি টাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিলের বৈদেশিক শাখায়, চাঁদপুর শাখায় তার হিসাব নম্বরে টাকা জমা দেই। তিনি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনে ডাটা অ্যান্ট্রি অপারেটর পদে চাকরি দিতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা ব্যাংকে প্রভিশন অফিসার পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। যখন দেখলাম প্রতারণার শিকার হচ্ছি, তখন তার কাছে টাকা ফেরত চাই। এরপর তিনি আমাকে ধানমন্ডির একটি হোটেলে নিয়ে সিটি ব্যাংকের একটি চেক দেন। কিন্তু পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তা বাউন্স হয়। মিঠুন চক্রবর্তী আরো বলেন, তিনি (ইমরান) রেন্ট-এ কারের গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্টিকার ব্যবহার করতেন। ইমরানের এসব প্রতারণার বিষয়ে তার স্ত্রী সবকিছু জানেন।
সিআইডি কার্যালয়ে আরেক ভুক্তভোগী শাহিনের অভিযোগ, ২০১৯ সালে তাকে ড্রাগস অ্যাসেনসিয়ালে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ইমরান। পরে তিনি ১ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। এছাড়া ছাত্রলীগের এক নেতার কাছ থেকে সরকারি দরপত্র পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৫৪ লাখ টাকা প্রতারণা করেছেন। আরেক ভুক্তভোগীকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, মঙ্গলবার তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা এবং সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আজ (বুধবার) তাকে আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।