‘পরের জায়গা, পরের জমি...’

শাহিনুর রহমান, দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা

‘ভোট আইলে পরে সবাই আমারে আদর কইরা কোলে নেয়। ভোট চইলা গেলে তার পর নেতারা আমারে ফেইক্কা মারে, আর কোনো খবর রাখে না।’ আক্ষেপ করে এমনটাই বললেন নবাবগঞ্জ উপজেলার বাহ্রা ইউনিয়নের দক্ষিণ চৌকিঘাটার বাসিন্দা মো. হারুন পাগলা। এলাকার সবাই তাকে এই নামেই চিনে। সরজমিনে দেখা যায়, হারুন তার ১২ বছর বয়সি স্বপ্না নামে এক মেয়ে ও স্ত্রী আছমাকে নিয়ে ১৫ বছর ধরে বাহ্রা দক্ষিণ চৌকিঘাটায় অন্যের ভিটায় ঝোপের মধ্যে পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে সহায় সম্বলহীন ভিটেমাটি হারা হারুন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করছে।

হারুন বলেন, ‘মা-বাবার কোনো ভিটেমাটি ছিল না। তারা মারা গেলে অনাদর-অবহেলায় বড় হই। পরে আমারই মতো আরেক অসহায় আছমাকে বিয়ে করে সংসার পাতি। বিয়ের পর আমরা উপজেলার কোমরগঞ্জ হাটের পাশে একটা ঝুপড়ি ঘরে থাকতাম। সেখানে রাতের কোনো এক সময় আমার প্রথম সন্তান পাঁচ বছরের সোহেলকে শিয়ালে কামড়ায়। ডাক্তার দেহাইলে পরে সে ভালো হয়। তার কিছুদিন পর লিভার খারাপ হইয়া মারা যায়। পরে ঐ জায়গা ছাইরা এই ঝোপের মইধ্যে ১৫ বছর ধইরা আছি। এইহানেই আমার মেয়ে স্বপ্না অয়। স্বপ্নার পর আক্তার নামে আর একটা ছেলে অয়। শরিলে রক্ত নাই টেকার অভাবে ডাক্তার দেহাইবার পারি নাই। পরে শরিল সাদা অইয়া চার বছর বয়সের সময় সেও মইরা যায়। এহন মেয়ে স্বপ্নাকে নিয়া আমি স্বপ্ন দেহি।’ হারুন আক্ষেপের সঙ্গে আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কত মাইনষেরে ঘর দিলো আমারে কেউ একটা ঘর দিলো না। আমি কোতায় যামু আমার মাইয়াডা বড় অইতাছে। ঝোপে থাকি পায়খানা করতে অয় অন্য বাইরত্তে। গোসল কইরা বউ মাইয়া কাপড় বদলাইবার পারে না। ঝড় তুফানে দৌড় দিয়া যাই কেলাব ঘরে। অনেক ভয়ের মধ্যে থাকি। রাইতে জাইগা থাকি খারাপ মাইনষের তো অভাব নাই।’ তিনি বলেন ‘আমি অনেক কষ্ট করছি আমার মাইয়াডার সুখ দেখবার চাই। টেকার জন্য অরে পড়াইবার পারি নাই। স্কুলে দেই নাই। অরে একটা ভাল দেইখা বিয়া দিয়া মরতে পারলে আমি শান্তি পামু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন আমারে একটা ঘর দেয় ।’

 বাহ্রা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ড. মো. সাফিল উদ্দিন মিয়া বলেন, এর আগে ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পে হারুনের নাম দিয়েছিলাম। জমি না থাকায় ঘর নিতে পারেনি। এবার তাকে আমরা ঘরের ব্যবস্থা করে দিব।’ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে ভাতা পাওয়ার জন্য তারা আমাদের কাছে আবেদন করলে তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম সালাউদ্দীন মনজু বলেন, হারুনের বিষয়ে জানতে পেয়ে তিনি সরেজমিনে গিয়েছিলেন। তার ঘরের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি। হারুনকে যেন আর ভিক্ষা করতে না হয় ছোট ব্যবসা করার জন্য কিছু টাকা সহায়তা করবেন বলেও জানান তিনি। তার পরিবারকে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।