অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর আপন কথা

বাড়ির দক্ষিণে বিশাল একটি চৌচালা ঘর। ভেতরে কোনো পার্টিশন নেই। একদম খোলা। দু-তিনটি দরজা আর কতগুলো জানালা। ওই ঘরে যারা থাকে তারা সব অবাক করা মানুষ। বীরপুরুষ, ত্রাতা, নায়ক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, কবি, পণ্ডিত, খেলোয়াড়—সবাই থাকে ওই ঘরে। আমরা যারা খুব ছোট তাদের কাছে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া বা না পড়ুয়া আমাদের এই ভাইদের এমনই মনে হতো। ওই আজব ঘরটিতে একবার আমি ঢুকে পড়েছিলাম। তখন আমি থ্রিতে বা ফোরে পড়ি। ওই ঘরে একজন কবি থাকত। কবির নাম আবু বকর। দুর্দান্ত ছাত্র। সবাই বলত মেট্রিকে স্টেন করবে। তখনো স্টেন করা মানে ‘দাঁড়াও’ ছাড়া আর কোনো অর্থ আমরা জনতাম না। ক্লাসে যখন শিক্ষক ঢুকতেন তখন ক্যাপটেন বলত ‘স্টেন’। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে যেতাম। তার মানে, স্টেন হলো ‘দাঁড়াও’। সুতরাং আবু বকর ভাই মেট্রিকে স্টেন করবে জেনে আমরা খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। আহারে, মেট্রিকের পরে আবু বকর ভাই আর বসতে পারবে না, শুইতে পারবে না, হাঁটতে পারবে না, দৌড়াতে পারবে না। সারাক্ষণ তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এ রকম একটি চিন্তা নিয়ে বেশিক্ষণ বসবাস করা যায় না। তাই ছোটরা সব সময় চিন্তা পালটিয়ে ফেলে। আর সেই পালটানোর গতি ঘোড়দৌড়কেও হার মানায়। ওই ঘরে আবুবকর ভাইকে দেখে আমার এসব কথা মনে হয়েছিল। কিন্তু যখন তার টেবিলে শুকনো বাঁশপাতা রঙের কাগজ দিয়ে মলাট দেওয়া একটি বই দেখতে পেলাম তখন ওইসব চিন্তা উবে গেল। সকল মনোযোগ গিয়ে পড়ল ওই বইটির উপর। জিজ্ঞেস করি, ‘ভাইজু, ওইডা কী বই?’

‘কী বই জানি না। নিবি, লইয়া যা।’

মনে হলো আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তার নেই। আমাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচে। আমি বইটি নিয়ে দৌড় দিই।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে এই প্রথম আমি কোনো বইয়ের নাগাল পাই। একটি টিনের পিস্তল, একটি লাল ঘুড়ি কিংবা চাবি টিপলে খাপ থেকে বেরিয়ে পড়া তিনটি চাকু হাতে পেলেও আমি এত খুশি হতাম না। দ্রুত আমি আমার পড়ার টেবিলে গিয়ে বইটির মলাট খুলে ফেলি। উদ্দেশ্য বইটির প্রচ্ছদ দেখা। বইটির নাম ‘আপন কথা’। প্রত্যেকটি বর্ণ রং করা। আ খয়েরি, প হলুদ, ন হালকা সবুজ, ক গাঢ় সবুজ এবং হলুদ। গাঢ় নীল দিয়ে লেখকের নাম লেখা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর নিচেই ফ্রেমে বাঁধাই করা লেখকের ছবি। ফ্রেমের চার কোনায় আলপনা আঁকা। আর এ সবকিছুই করা হয়েছে ফুল আঁকা শেওলা রঙের জমির উপর। মলাটের উপরের পৃষ্ঠায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখাবয়বের ছবি। পেনসিলে আঁকা স্কেচ। অখ্যানের শিরোনামগুলো হাতে আঁকা ক্ল্যালিওগ্রাফি। শেষে চিত্রকর্ম। ভেতরেও কোথাও কোথাও সামান্য আলপনা আঁকা।

৩২ পৃষ্ঠার পর থেকে বেশ কয়েকটি চিত্রকর্ম। বারান্দায় বসে যেন ধ্যান করছেন অবনঠাকুর। পরের ছবিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। ওই একই বারান্দায়, চোখে চশমা, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। তারপরের ছবিতে প্রাসাদোপম বাড়ির কিছু অংশ, বাগান আর হাতলওয়ালা বেঞ্চি। এরপর ছবিটি আঁকা হয়েছে যেন বাইরে থেকে, দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে। অবনঠাকুর দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। বাড়ির অনেকটা অংশের সঙ্গে তাঁর নিমগ্ন দাঁড়িয়ে থাকার ছবি। তিনতলাসমেত পুরো বাড়িরও একটি ছবি আছে তারপর। আরেকটি ছবিতে দেখা যায় বেঞ্চিতে বসে রসিয়ে রসিয়ে কিছু লিখছেন গদ্যের কবি, ছবির কবি অবনঠাকুর। শেষ ছবিতে বাগানসহ বাড়িটা যেন আকাশ থেকে দেখা। প্রত্যেকটি ছবি তাঁরই আঁকা। সাদা-কালো। এর মধ্যে আলো-আঁধারের এমন ব্যবহার, ডিটেইলেসর এমন নিখুঁত মাপজোখ এবং প্রতিটি আঁকে বস্তুর মধ্যে এমন প্রাণের সঞ্চার, একদম প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ধ্রুপদী শিল্পের চিরায়ত রূপ-রস-আনন্দ আমাদের অভিভূত করে। মনে হয়, এই চোখ, এই মন, এই দেহ, এই আত্মা খুশি হলো, তৃপ্ত হলো এবং সন্তুষ্টির একটি মধুর প্রবাহ আমাদের দেহ-মন জুড়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

এত সুন্দর বই কী করে হলো ভেবে আমি অবাক হয়ে যাই। বইটি নিয়ে কত প্রশ্ন যে মাথায় ঘুরছে তার ইয়ত্তা নেই। আর এ সবের কোনো উত্তর পাওয়াও সম্ভব নয়। বড় ভাই বলেছে, এগুলো করেছেন সত্যজিত্ রায়। প্রচ্ছদে দেখলাম ওই নাম। এর বাইরে সে আর কিছু বলতে পারল না। আমার মাথায় আর কিছু ধরে না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছি। তিনি বিশ্বকবি। মানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কবি। লোকটির নাম পড়ে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ভাই। নাকি ওই পরিবারের লোক। নাকি ভুল করে রবীন্দ্রনাথ লিখতে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথ লিখে ফেলেছে। হতে পারে। কারণ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তো এর চেহারার কোনো মিল নেই। এর মাথায় টাক। দাড়ি-গোঁফ কিচ্ছু নেই। মুখের গড়নও আলাদা।

আজ থেকে পঁচাত্তর বছর আগে ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে কলকাতার সিগেনট প্রেস থেকে প্রকাশিত ওই বইটি আমি হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ওই বইটির স্মৃতি আমি কোনো দিন হারাবো না। কল্পনা করে কিছু লেখার যে প্রেরণা আমার অজান্তেই আমার উপর ভর করেছিল তার মূলে আছে ‘আপন কথা’র কল্পনাপ্রতিভা—রূপ-রস-সৌন্দর্য। আজ এই পঞ্চান্ন বছরের জীবনে এমন কল্পনাঋদ্ধ বই আমি আর দ্বিতীয়টি পাইনি।

১৪৬ পৃষ্ঠার বইটিতে আটটি আখ্যান আছে : ‘মনের কথা’, ‘পদ্মদাসী’, ‘সাইক্লোন’, ‘উত্তরের ঘর’, ‘এ-আমল সে-আমল’, ‘এ-বাড়ি ও-বাড়ি’, ‘অসমাপিকা’ এবং ‘বসত বাড়ি’। সবগুলো নিয়ে কথা বলা যাবে না। শুধু ‘মনের কথা’ নিয়ে দুটো কথা বলি।

‘মনের কথা’ অখ্যানটুকুর শুরুটা লক্ষ করি। অবনঠাকুর লিখেছেন, ‘যে-খাতার সঙ্গে ভাব হলো না, তার পাতায় ভালো লেখা চললো না। এই খাতাটা অনেকদিন কাছে-কাছে রয়েছে। ভাব হয়ে গেলো এটার সঙ্গে। ভাব হলো যে-মানুষের সঙ্গে কেবল তাকেই বলা চললো নিজের কথা সুখ-দুঃখের। আমার ভাব ছোটোদের সঙ্গে— তাদেরই দিলাম এই লেখা খাতা।’ শব্দচয়ন আর বাক্যগঠনে এমন মধুরতা খুব কি বেশি পাওয়া যায়? ওই যে একটুখানি কথা ‘যে খাতার সঙ্গে ভাব হলো’ ওইটুকু পড়েই আমার হূদয় জুড়িয়ে গিয়েছিল। তা-ই তো। ভাবই তো। শৈশবের সেই দিনগুলোতে ভাব না হলে চলত না। ভাব হতে হবে। কত কিছুর সঙ্গে যে আমাদের ভাব হতো! খাতার সঙ্গে, কলমের সঙ্গে, স্লেটের সঙ্গে, পেনসিলের সঙ্গে। কোনো একটা বইয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের ছড়া ‘আমাদের ছোট নদী’।

‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।

পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,

দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।’

আমাদের শৈশবের জীবন পাগল করে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি ছবির কবিতার কি প্রয়োজন হতো! চারটি মাত্র পঙিক্ত দিলাম। গুনে দেখুন তো কতগুলো ছবি আছে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে আবার কী যে একটা গতি, কী যে একটা প্রবহমানতা আছে! এই ছবি আর এই গতির সঙ্গে আমাদের শৈশব, আমাদের শৈশবের কল্পনার জগত্ আলোড়িত হয়ে উঠত। এই কবিতা পড়ে আমরা আর কবিতার মধ্যে থাকতে পারতাম না। কোথায় কোন ছোট নদী, তার স্বচ্ছতোয়া হাঁটু জল, ‘চিক্ চিক্ করে বালি’ মানে কাদার লেশমাত্র নেই, হাঁটতে খুব মজা আরও কত বিষয়। কিন্তু সবচেয়ে আপন হয়ে থাকল ওই ছবিটা—কবিতাটির চারদিকে ঘিরে পাতাজুড়ে যে ছবিটা ছিল। কে এঁকেছেন রনবী, হাশেম খান, কাইয়ুম চৌধুরী, মোস্তফা মনোয়ার? মনে নেই। কিন্তু ছবিটা মনে আছে। আর ওই যে নিঃসঙ্গ একটি তালগাছ দাঁড়িয়ে ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’—ওই কবিতায় ছবি এঁকেছিলেন কে? আজও ওই তালগাছটির জন্য মায়া পড়ে আছে। ভেবে ভেবে কষ্ট পাই—কই, এখন তো আর ওই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ পাই না। আহারে জীবন!

এহেন আমাদের জন্য অবনঠাকুর যা লিখে গেছেন তার পরিমাণ যে খুব বেশি তা কিন্তু নয়। বরং বলা যায়, খুব কম লিখেছেন তিনি। ওই কমের মধ্যে তিনি এত বেশি ছবি এঁকেছেন, শিশুর কল্পনাকে উসকে দেওয়ার জন্য এত রং-রেখা-রূপ-রস রেখেছেন, প্রত্যেক শিশু তার মধ্যে আপন আপন জগত্ খুঁজে নিতে পারে। তাই অবলীলায় তিনি লিখেছেন :

‘যারা কেবল শুনতে চায় আপন কথা, থেকে থেকে যারা কাছে এসে বলে ‘গল্প বলো’ সেই শিশু-জগতের সত্যিকার রাজা-রানী-বাদশা-বেগম তাদেরই জন্যে আমার এই লেখা পাতা ক’খানা। শিশু-সাহিত্যে সম্রাট যাঁরা এসেছেন বা আসছেন তাঁদের জন্যে রইলো বাঁহাতে সেলাম; আর ডান হাতের কুর্নিশ রইলো তাদেরই যারা বসে শোনে গল্প রাজা-বাদশার মতো, কিন্তু ছেঁড়া মাদুর নয়তো মাটিতে বসে, আর গল্পের মাঝে মাঝে থেকে থেকে যারা বকশিশ দিয়ে চলে একটু হাসি কিম্বা একটু কান্না; মান-পত্রও নয়, সোনার পদকও নয়; হয় একটু দীর্ঘশ্বাস, নয় একটুখানি ঘুমে-ঢোলা চোখের চাহনি! ঐ তারা— যারা আমার মনের সিংহাসন আলো করে এসে বসে, তাদেরই আদাব দিয়ে বলি, গরীব পরবত্ সেলামাত্— অব্ আগাজ্ কিসেসকা করতা হুঁ, জেরা কান দিয়ে কর শুনো!’

আদাব দিয়ে অবনঠাকুর কী বলেছেন আমি বুঝিনি। আজও বুঝি না। কিন্তু তাতে রসাস্বাদনে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। হূদয় দিয়ে অনুভব করি প্রাণের মানুষের সান্নিধ্য। অনুভব করি গল্পপাগল মানুষগুলোর উষ্ণতা। অবনবাবু ওদের কাছেই ফাঁদতে চান তাঁর গল্পের আসর। ওরাই তাঁর গল্পের জগতের রাজা-রানি-বাদশা-বেগম। আর ওদের ওই যে হাসিটুকু, কান্নাটুকু, দীর্ঘশ্বাসটুকু, ঘুমে ঢোলা চাহনিটুকু—এই তাঁর সম্বল, তাঁর অমূল্য উপহার।

এত যে প্রাণ দিয়ে প্রাণের কথা বলেছেন অবনঠাকুর তার পরেও কি সব কথা বলা হয়েছে? হয়নি। পৃথিবীর কোনো কবি, কোনো কথাশিল্পী, কোনো চিত্রশিল্পী কোনোদিন তার সব কথা, সব দুঃখগাথা, আনন্দের সব কোলাহল, অভিজ্ঞতার সবটুকু কোনোদিন আঁকতে পারেননি অক্ষরে, তুলির আঁচড়ে, মাটির প্রলেপে। কেউ পারে না। জন্মজন্মান্তরেও সম্ভব নয়। কষ্টের সঙ্গেই সেই অতৃপ্তি ব্যক্ত করেছেন অবনঠাকুর। সেই শৈশবে মনে হয়েছে, আহা! কী আনন্দ! পয়সা খরচ করেও সবটুকু কিনতে পারল না কেউ। লেখকের পক্ষাবলম্বন করে বেশ তৃপ্তি পেয়েছিলাম আমিও। আজ পরিণত বয়সে এসে বুঝি, ক্ষরণ কোথায় হচ্ছে। ওই জায়গাটুকু উল্লেখ করি।

‘ছাপা হবে হয়তো বইখানা। একদিন কোনো বেরসিক অল্প দামে কিনে নেবে আমার সারা-জীবন খুঁজে পাওয়া যা কিছু সংগ্রহ। এইটে মনে পড়ে যখন, তখন হাসি পায়। বলি, এ কি হয় কখনো? সব কথা কি কেউ জানতে পারে, না জানাতেই পারে কোনো কালে? অনেক কথা রয়ে যাবে, অনেক রইবে না, এই হবে তার বেশি নয়।’

জানতে না পাড়ার দুঃখ পাঠকের। সেই দুঃখ অজানাই থেকে যায়। সেই দুঃখের কোনো গড়ন নেই, পরিধি নেই, আকার-আকৃতি নেই। কিন্তু যিনি মনে করেন, জানাতে পারলেন না তার হাসির অন্তরালে কষ্টের বহতা নদী। ওই নদীতে সাঁতার কাটার কোনো লোক নেই। সেখানে সাঁতারু একজনই, তিনি কবি, কথাশিল্পী, চারুশিল্পী। একটা শোনা কথা তিনি বলেছেন। রবীন্দ্রনাথও ওই কথা বলেছেন। প্ল্যানচিট চালিয়ে ভূত নামানোর কথা। দাদামশায় মানে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর একজন পার্ষদ দীননাথ ঘোষাল। তাঁর আত্মা এসে হাজির। অবনঠাকুর লিখেছেন :

“বড়ো জেঠামশায় তাঁকে জেরা শুরু করলেন— পরকালটা এবং পরকালটার বৃত্তান্ত শুনে নিতে চেয়ে। প্ল্যানচিটের উত্তর বার হলো — ‘যে-কথা আমি মরে জেনেছি, সে-কথা বেঁচে থেকে ফাঁকি দিয়ে জেনে নেবে এ হতেই পারে না।’

আমিও ঐকথা বলি। অনেক ভুগে পাওয়া এ-সব কাহিনী, কিনতে গেলে ঠকতে হয়, বেচতে গেলে ঠকতে হয়!”

এ শিল্প। বেচা-কেনার জিনিস নয়। টাকা-কড়ির জিনিস নয়। এ হলো ভাবের জিনিস, ভালোবাসার জিনিস, হূদয় নিংড়ে অনুভবের জিনিস। এই ভবে, এই ভাবে, এই জগতে যারা মরেনি তাদের পক্ষে কেনা-বেচা। যারা মরেছে তাদের পক্ষে মুক্তি। আমাদের সেই শৈশবে জগতের কেনা-বেচার সঙ্গে পরিচয় ছিল না, টাকা-কড়ি, লাভ-লোকসান বুঝিনি। আমরা তখন ভালোবাসা বুঝতাম, মমতা বুঝতাম। যুক্তি-অযুক্তি বুঝতাম না। অসম্ভবের কোনো জগতের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল না। আকাশ-পাতাল-মর্ত, ভূত-প্রেত, দেও-দানার সঙ্গে আমাদের ছিল নিত্য বসবাস। অবনঠাকুর তাই আমাদের কাছেই জিম্মা রেখেছিলেন তাঁর সৃষ্টি। কেননা, তিনি ভালোবেসে বিশ্বাস করতেন যে— 

“বলে যাওয়া চলে কেবল তাদেরই কাছে নির্ভয়ে, মনের কথা বেচা-কেনার ধার ধারে না যারা, যাত্রা করে বেরিয়েছে যারা, কেউ হামাগুঁড়ি দিয়ে, কেউ কাঠের ঘোড়ায় চড়ে, নানা ভাবে নানা দিকে আলিবাবার গুহার সন্ধানে; ছোট ছোট হাতে ঠেলা দিয়ে যারা কপাট আগলে বসে আছে, যে-দৈত্য সেটাকে জাগিয়ে বলে ‘ওপুন চিসমৃ’— অর্থাত্ চশমা খোলো, গল্প বলো। যারা থেকে থেকে ছুটে এসে বলে — ‘এই নুড়ি ছোঁয়াও, দেখবে দাদামশায়, লোহার গায়ে ধরে যাবে সোনা!’ কুড়িয়ে পাওয়া পুরনো পিদিম ঘসে ঘসে যারা খইয়ে ফেলে, অথচ ছাড়েন না কিছুতে সাত-রাজার-ধন মানিকের আশা।”

খুব মনে আছে, পরশপাথর খোঁজার সেই দিনগুলোর কথা। লোহাতে লাগাব, লোহা সোনা হয়ে যাবে, ইট-পাথরে লাগাব, ইট-পাথর সোনা হয়ে যাবে। খাল থেকে, বিল থেকে, পুকুরের পাড় থেকে চকচক করে এমন কত কীযে সংগ্রহ করেছিলাম! ওই সবই ছিল পরশপাথর। লোহাতে লাগিয়েছি, লোহা সোনা হয়ে গেছে। ইট-পাথরে লাগিয়েছি। ইট-পাথর সোনা হয়ে গেছে। শৈশবের সঙ্গীরা কেউ তো বলেনি, সোনা হয়নি। ঝগড়া ছিল শুধু ওইটুকুতে—কার স্বর্ণ ভালো হয়েছে, কারটা পচা। জগেজাড়া বিশ্বাসের সেই জগত্টা কীভাবে যে হারিয়ে গেল! এখনো খুঁজি। পাই না। শুধু চোখের জলে ভাসি। অবনঠাকুর, তোমাকে নমস্কার।