ছায়াপথ

মাধব রায়

কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

 

বর্ণালি নিয়ে গল্প শেষ হবার পর বিন্দু বলল-আজ আমরা পড়তে বসব না বাবা।

কেন?

আজকে আমার বন্ধু এসেছে? বর্ণালি, একে নিয়ে আমরা গল্প করব।

আচ্ছা ঠিক আছে, বললেন নীলকান্তবাবু। রাতে খাবার পর সবাই মিলে উঠে এলো ছাদে। রাতের আকাশটা চমত্কার। চাঁদ উঠেনি আজ, তবে তারায় ঝলমল করছে আকাশ। তারাগুলো কোনও কোনওটা একটু দূরে দূরে, আবার কোনও কোনওটা কাছে কাছে। আকাশের এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে আলোর এক অস্পষ্ট কুয়াশার মতো ধারা বয়ে গেছে। এদিকে তাকিয়ে রেখা বলল-এই আলোক রেখাটা কিসের বাবা?

নীলকান্তবাবু বললেন-এগুলো হচ্ছে ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি। এর আবার অন্য নামও আছে। যেমন মিল্কিওয়ে, আকাশগঙ্গা, সুরগঙ্গা বা স্বর্গগঙ্গা।

নামগুলো তো সুন্দর, বর্ণালি বলল।

হ্যাঁ, নামগুলো সুন্দর। এই ধরনের নামকরণ করার কারণগুলো আরও মজার, নীলকান্তবাবু বললেন। গ্রিক পুরাণ রচয়িতারা কল্পনা করেছেন জিউস এর স্ত্রী হেরার বুক থেকে ছড়িয়ে পড়েছে দুধের ধারা। তাই তাঁরা এর নাম রেখেছেন ভিয়া ল্যাকটিয়ে (Via Lactea) বা দুগ্ধপথ। আবার অন্য একটি মতে দেবী জুনো যখন তার শিশুপুত্র হারকিউলিসকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন, তখন জুনোর বুক থেকে ছিটকে পড়া দুধ থেকেই এই ছায়াপথের জন্ম। এই জন্য মিল্কিওয়ে। আবার ভারতীয় জ্যোতির্বিদগণ কল্পনা করেছেন, আকাশ পথে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে, নাম দিয়েছেন আকাশগঙ্গা।

মজার ঘটনা তো। কমলাও এই গল্পে যোগ দিয়েছেন। পৌরাণিক চিন্তা ভাবনাগুলো মাতৃকেন্দ্রিকই ছিল তাহলে, বললেন তিনি।

নীলকান্তবাবু বললেন, তবে মানুষ শুধু পৌরাণিক কাহিনি-কল্পনার মধ্যেই সীমিত থাকেনি। ডেমোক্রিটাস খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে কল্পনা করেছেন, এই আলোর পিছনে রয়েছে অস্পষ্ট তারা। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিলিও দূরবিন দিয়ে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, ছায়াপথ হচ্ছে গুচ্ছে গুচ্ছে ছড়ানো অজস্র তারার সমষ্টি। ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে সুরকার ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল, যিনি ইউরেনাস আবিষ্কার করেছেন, তিনি তারা গুণতে শুরু করেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, ছায়াপথ হচ্ছে তারার একটা থালা এবং আমরা মানে সৌরজগত্ এই থালার মধ্যেই রয়েছে। তবে ছায়াপথ কত বড়, তা তিনি বলতে পারেনি।

চন্দ্রা বলল-আমরাও আছি এই থালার মধ্যে?

হ্যাঁ, আমরাও আছি এই থালার মধ্যে, বললেন নীলকান্ত বাবু।

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে জেসি কাপটেইন ছায়াপথের আকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কয়েক হাজার পারসেক এর বেশি দূর দেখতে পাননি। তাই তিনি বলেন ছায়াপথের থালাটি বেশি বড় নয়।

পারসেক কী মামা? পারসেকেন্ড? আকাশ বলল।

না, পারসেক হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানে দূরত্ব মাপার একক-বললেন নীলকান্তবাবু। এক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দৈর্ঘ্যের বৃত্তচাপ যে দূরত্বে এক সেকেন্ড কোণ উত্পন্ন করে তাকে বলে এক পারসেক।

বর্ণালি বলল-অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট মানে?

অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট হচ্ছে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী গড় দূরত্ব। তুমি কি জানো এই দূরত্ব কত?

হ্যাঁ, জানি, বলল বর্ণালি, ১৫কোটি কিলোমিটার বা ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল।

ঠিক বলেছ, থ্যাংক ইউ, বললেন নীলকান্তবাবু। সেই হিসাবে এক পারসেক হচ্ছে মোটামুটি ৩০৮৫৭ বিলিয়ন কিলোমিটার। জেসি কাপটেইন মনে করতেন আমাদের সূর্য আছে ছায়াপথের কেন্দ্রে। কিন্তু আসলে সূর্য কেন্দ্র থেকে ৮ থেকে ১০ হাজার পারসেক দূরে অবস্থিত। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে হার্লো শেপলি বলেন, ছায়াপথের থালাকৃতি এলাকার উপরে নিচে ঝাঁকে ঝাঁকে বটিকাকার তারাগুচ্ছ রয়েছে।

তাহলে ছায়াপথ আসলে কত বড়? সীমা বলল।

অণু বলল, বোঝা যাচ্ছে এর কোনও সীমা নেই।

নীলকান্তবাবু বললেন, আসলেও তাই। এখনকার হিসাব মতে ছায়াপথের ব্যাস ৩০ হাজার পারসেক। আর পুরুত্ব প্রায় ৪০০ পারসেক। আমরা যখন ছায়াপথ দেখি, তখন বাইরে থেকে দেখি না, ভিতর থেকেই দেখি। কারণ আমরা এর ভিতরেই রয়েছি।

চন্দ্রা বলল-আচ্ছা মামা, ছায়াপথ কি ঘুরছে?

হ্যাঁ, ছায়াপথও ঘুরছে। মহাশূন্যে যা কিছু আবর্তিত হয়, তা-ই চ্যাপ্টা হয়ে যায়। ছায়াপথও চ্যাপ্টা, কাজেই ছায়াপথও ঘুরছে। ছায়াপথে কতগুলো তারা রয়েছে? বললেন কমলা।

তা ধরো এক একটা ছায়াপথে প্রায় ১০ হাজার কোটি তারা রয়েছে। বললেন নীলকান্তবাবু।

তার মানে, সীমা বলল আমাদের ছায়াপথে এই সূর্যের মতো দশ হাজার কোটি সূর্য রয়েছে?

সবাই অবাক হলো এই সংখ্যা শুনে। নীলকান্তবাবু হাসলেন। বললেন শুধু তা-ই নয়। এই ছায়াপথ আকাশগঙ্গা ছাড়াও মহাবিশ্বে আরও কোটি কোটি ছায়াপথ রয়েছে। সেখানেও হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র বা তারা বা সূর্য রয়েছে।

সব গ্যালাক্সি কি দেখতে একই রকম? অণু বলল।

না, সবগুলো একই রকম নয়। কোনও কোনও ছায়াপথ উপবৃত্তাকার, কোনও কোনওটা সর্পিল।

আমাদের ছায়াপথ থেকে কাছে কোন ছায়াপথ বাবা? বিন্দু বলল।

আকাশগঙ্গা থেকে সবচেয়ে কাছে যে ছায়াপথ, তার নাম এনড্রোমিডা। এটি একটি সর্পিল ছায়াপথ। আকাশগঙ্গা থেকে এর দূরত্ব ২০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। আলোকবর্ষটা আবার কী? বর্ণালি বলল।

                পরের অংশ আগামীকাল