তপন কুমার দাস, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বোবারথল ভারত সীমান্তসংলগ্ন একটি এলাকা। দুর্গম পাহাড়ি এই এলাকার ১২টি গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বাস। বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরের এই এলাকাটিতে বাঙালি ও আদিবাসী খাসি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। এই এলাকার মানুষের সারা বছরের বড় সমস্যা হচ্ছে খাওয়াসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারের পানি। তাদের বিভিন্ন পদ্ধতিতে পাহাড়ি ঝরনা, পাহাড় চুইয়ে পড়া পানি সংরক্ষণ করেই খাবার এবং দৈনন্দিন কাজ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডটি বোবারথল নামে পরিচিত। এখানে বোবারথল, দক্ষিণ গান্ধাই, মাঝ গান্ধাই, পেকুছড়া, ইসলামনগর, শান্তিনগর, গান্ধাই পুঞ্জি, কুসবা নগর, বারোঘরি, ষাইটঘরি, করইছড়া ও উত্তর করইছড়া গ্রামের অবস্থান। আনুমানিক ১৯৬৫ থেকে ঐ এলাকায় মানুষের বসতি শুরু। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাদ্রাসা ছাড়াও আছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু এলাকাটিতে পানির সংকট তীব্র। যুগ যুগ ধরে তাদের পানির কষ্ট চলছে। বর্ষায় মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পাঁচ মাস ভোগান্তি বেড়ে যায়। এ সময় পানির বেশির ভাগ উত্স শুকিয়ে যায়। খাবার, ধোয়ামোছাসহ নিত্যকাজে পানির এই আকাল থাকে বর্ষার আগ পর্যন্ত। তখন কয়েক কিলোমিটার দূরের প্রাকৃতিক কোনো উত্স থেকে তাদের পানি সংগ্রহ করতে হয়। বর্ষার সাত মাস রিং কুয়া, ঝরনা ও পাহাড় চুইয়ে পড়া পানিই তাদের ভরসা। এসব উত্স থেকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে তারা পানি ছেঁকে সংগ্রহ করেন। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন ঐ এলাকার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ গান্ধাই গ্রামের ফখর উদ্দিন ঘরের সঙ্গে পাকা করে একটি চৌবাচ্চা বা ট্যাংকে পানি জমানোর ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে উঁচু পাহাড়ের ঝিরি থেকে প্লাস্টিকের পাইপ ও বাঁশের মাধ্যমে চুইয়ে পানি এসে পড়ছে। এ পানি ছেঁকে খাবার ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করছেন তার স্ত্রী। ফখর উদ্দিনের মতো বেশির ভাগ বাড়িতে এভাবেই পানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে কুয়া থেকে ও সড়কের পাশের পাহাড় চুইয়ে পড়া পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায় অনেককে।
ফখর উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট পানির। এই কষ্ট কবে ঘুচবে বলতে পারি না।’ তিনি জানান, বর্ষায় মোটামুটি পানি পাওয়া যায়। কিন্তু শুকনো মৌসুমে পানি সংগ্রহ করতে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াতে হয়। তাও ভালো পানি পাওয়া যায় না। ময়লাযুক্ত পানি ছেঁকে, চুলায় ফুটিয়ে পান করতে হয়। নোংরা পানি খেয়ে অনেকেই নানারকম অসুখে পড়ে। এলাকার নাজমা বেগম বলেন, ‘সরকার আমরার পাড়ি (পাহাড়ি) এলাকাত বিদ্যুত্ দিরা (দিচ্ছেন)। হুনছি রাস্তাও অইব (শুনছি রাস্তা হবে)। কিন্তু সবতার (সবার) আগে আমাদের পানির কষ্ট দূর হওয়া দরকার। আমরা কুয়া, ঝরনা, পাড় বাইয়া (পাহাড় বেয়ে) পড়া (চুইয়ে) পানি খাইরাম। ইতা (এসব) থাকি পানি সংগ্রহ করা খুব কষ্ট। গান্ধাই খাসি পুঞ্জির প্রধান (মান্ত্রী) রাজেশ পঃস্না বলেন, আমাদের পুঞ্জিতে পানির অভাবে খাওয়া-দাওয়া, রান্না-বান্না ও গোসল করা খুবই কষ্টকর। শীতের দিনে পাহাড়ের নিচ থেকে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে পানি সংগ্রহ করতে হয়।’
দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন বলেন, এখানে নলকূপ স্থাপন করা যায় না। রিং টিউবওয়েল (পাতকুয়া) স্থাপন করলেও পানি মিলে না। মানুষ খুব কষ্ট করছে। রিং কুয়াতে শুকনো মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না। বছরে প্রায় পাঁচ মাস পানির বেশি কষ্ট। অন্য সময় পানি মিললেও তা বিশুদ্ধ নয়। পানির বিকল্প ব্যবস্থা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বড়লেখা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন বলেন, বোবারথল পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় মাটির ৫০ থেকে ১০০ ফুট নিচেও পাথরের স্তর পাওয়া যায়। ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা যায় না। দূরবর্তী কোনো এলাকা থেকে উত্পাদক নলকূপ স্থাপন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব গ্রামে পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এরকম একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।