ইত্তেফাক রিপোর্ট
জাতীয় পার্টির (জাপা) চিফ প্যাট্রন রওশন এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে এরিক এরশাদের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলটিতে নানামুখী আলোচনা, সমালোচনা ও বিশ্লেষণের অন্ত নেই। দলটির প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে বুধবার তারই ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ পুত্র এরিক এরশাদ অনেকটা আকষ্মিকভাবে এরশাদপত্নী রওশনকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে এরিক ঘোষণা দেন, তার মা বিদিশা ও বড় ভাই রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ এখন থেকে দলের কো-চেয়ারম্যান। এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’ আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে হঠাত্ এরিকের এমন ঘোষণাকে জাপা ‘গুরুত্ব দিচ্ছে না’ বললেও এনিয়ে ভেতরে-ভেতরে রয়েছে কৌতুহল। এর পেছনে জাপার কোনো নেতা সম্পৃক্ত রয়েছেন কি-না, কিংবা আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন কি-না সেটিই এখন সন্ধান করছেন জাপা নেতৃত্ব।
এরিকের ঘোষণার পরপরই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে যেটি সামনে আসে সেটি হল আসলেই কি এর সঙ্গে রওশন এরশাদ সম্পৃক্ত আছেন? জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ দলটির নেতা-কর্মীদের কাছেও এটিই ছিল জানার মূখ্য বিষয়। এরিকের ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট বিটের সাংবাদিকরা রওশনের বক্তব্য জানতে নানাভাবে চেষ্টা করেন। তিনি কারোই ফোন ধরছিলেন না। এই প্রতিবেদকও বুধবার প্রথমে অন্তত ১০ বার ফোন করে তার বক্তব্য জানতে ব্যর্থ হন। অবশ্য পরে রাত ৮টা ২ মিনিটের দিকে রওশন ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘এসব ঘোষণা সম্পূর্ণ অবান্তর। আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি। আমি এসব বিষয়ে কিছু জানিও না। আমি অসুস্থ, বাসায়। আর আমি তো পার্টির চেয়ারম্যান হব না-এটা আগেই বলেছি।্ সুতরাং এখন তো আমার চেয়ারম্যান ও সাদের কো-চেয়ারম্যান হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
ইত্তেফাককে দেওয়া রওশনের এই বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়েও জাপার ভেতরে ও বিদিশা-এরিক বলয়ে বহুমুখী কথা ওঠে। কোনো কোনো সূত্র জানায়, আগামী রবিবার রওশন তার অবস্থান পরিস্কার করবেন। সামগ্রিক বিষয়ে রওশন এরশাদ গতকাল শুক্রবার রাত ৮টা ১৮ মিনিটে মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, ‘আচ্ছা আমি তো অসুস্থ, আমার শরীর ভালো না। কেন এত কথা হচ্ছে? ওরা (এরিক) আমাকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করার কে? ওরা কেন এসব করছে?’ এই প্রতিবেদককে রওশন আরও বলেন, ‘আমি তো ওইদিনই (বুধবার রাতে) আপনাকে ক্লিয়ার কথা বলে দিয়েছি। এরপর তো এসব নিয়ে আর কথা থাকতে পারে না। এসব নিয়ে বারবার কী বলবো। আপনারা এটা নিয়ে আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না।’
ইত্তেফাকের সঙ্গে প্রথম দফায় রওশনের কথা হয়েছিল বুধবার রাত ৮টা ২ মিনিটে। ওইদিনই রাত ১১টায় জাপার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওইদিন সন্ধ্যায় জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে ফোনালাপে রওশন এরশাদ জানিয়েছেন তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী নন। জিএম কাদেরের নেতৃত্বে পার্টি সঠিকভাবে চলছে বলেও মনে করেন রওশন। সেই সাথে তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের সাফল্য কামনা করেন।
এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর প্রায় এক ঘণ্টা পর জিএম কাদের ইত্তেফাককে জানান, রওশন এরশাদ বুধবার সন্ধ্যায়ই তাকে ফোন করেছিলেন। তবে তিনি নিচে হাটতে যাওয়ায় তখন নিজে রওশন এরশাদের ফোন ধরতে পারেননি। রওশন এরশাদ কথা বলেছেন তার স্ত্রী শেরিফা কাদেরের সঙ্গে। পরে বাসায় ফিরে জিএম কাদের রওশনকে ফোন করে কথা বলেন। এসময় রওশন তাকে বলেছেন- পার্টির চেয়ারম্যান হওয়ার আগ্রহ তার নেই।
রওশনের আগে এরিকের ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জিএম কাদেরও। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দলীয় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেছেন, ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক নয়, এমন এক শিশুর ঘোষণায় একটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হতে পারে না। রাজনৈতিক দল গঠন করতে নীতিমালা রয়েছে।’ একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলের ঘোঘণায় এবং রওশন এরশাদের সঙ্গে কথা না বলেই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ-প্রচারের যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
রওশন এরশাদ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেও তার পুত্র ও রংপুর-৩ আসনের এমপি সাদ এরশাদ এখনও নিরব। বুধবার প্রেসিডেন্ট পার্কের অনুষ্ঠানে সাদ উপস্থিত ছিলেন। একইমঞ্চে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশার একপাশে বসেছিলেন সাদ, আরেকপাশে ছিলেন এরিক। সেই মঞ্চেই এরিক এই ঘোষণা দেন। আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের সেই অনুষ্ঠানে সাদ তার বক্তব্যে এরিকের ঘোষণার পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলেননি। সেই বক্তব্যে সাদ বলেছিলেন, ‘আমরা জঞ্জালমুক্ত থাকতে চাই। এখানে পলিটিক্যাল কথা বলতে আসিনি। আজ আমার আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী। আমার আম্মাও অসুস্থ। সবাই তাদের জন্য দোয়া করবেন।’তবে এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সাদ তার অবস্থান স্পষ্ট করেননি। এমনকি তিনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। সামগ্রিক বিষয়ে বিদিশা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, এরিকের ঘোষণার পর তারা পার্টির কার্যক্রম সামনে এগিয়ে নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে গুলশানে পার্টির নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়েছে। পার্টির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা খুশি। তিনি জানান, পার্টির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তবে কৌশলগত কারণে কেউ এখন মুখ খুলছেন না। এদিকে, বুধবার প্রেসিডেন্ট পার্কের দোয়া মাহফিলে এরশাদ ট্রাস্টের আমন্ত্রণে কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকও উপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনারও ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা জাপার প্রবীণ নেতা ও সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান ইত্তেফাককে জানান, কয়েকজন বিদেশি এসেছিলেন।