দেশে দেশে অস্থিরতার কারণ ও প্রতিকার

হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনাল মোইজিকে নিজ বাসভবনে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হইয়াছে একদল আততায়ীর মাধ্যমে; কিন্তু কী ছিল তাহার অপরাধ? তাহার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ তিনি পাতানো ও কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং ক্ষমতা প্রলম্বিত করিবার জন্য মাত্র চার বত্সরের শাসনামলে ছয় জন প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্তসহ সংবিধান পরিবর্তনে পরিকল্পনা করেন গণভোটের। ডিক্রি জারি করিয়া ক্ষমতায় ছিলেন এবং তাহার হত্যাকাণ্ডের পূর্বের দিন সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে যাহার নাম ঘোষণা করেন, তিনি শেষপর্যন্ত শপথই নিতে পারেন নাই। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরিয়া চলিয়াছে দাঙ্গা, সহিংসতা ও লুটপাট, যাহাতে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত হইয়াছেন ২১২ জন। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমাকে আদালত অবমাননার দায়ে ১৫ মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার জেরে সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভ-সহিংসতা শুরু হয়। ৭৯ বত্সর বয়সি এই নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলমান। জ্যাকব জুমার সমর্থকরা বলিতেছেন, এই সকলই সাজানো নাটক এবং তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সম্প্রতি কিউবায় করোনা মোকাবিলা ও নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হইয়াছে এবং নিহত হইয়াছেন এক জন। ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা ফ্রেডি গুয়েভারাকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী মিয়ানমারে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উত্খাত করিয়া সামরিক জান্তার মাধ্যমে সেইখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হইয়াছে। প্রতিবেশী আরেকটি দেশ নেপালে জুডিশিয়াল ক্যুয়ের মাধ্যমে সরকারের পালাবদল ঘটিয়া গিয়াছে। ইহা নিজের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করিতে বারংবার পার্লামেন্ট ভাঙিয়া দেওয়া ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করিবার খেসারত ছাড়া আর কিছু নহে।

ইউরোপের দেশ ও রাশিয়া-সংলগ্ন বেলারুশও অস্থিতিশীল। সেখানকার একনায়ক প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুব্ধ। ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট দুতার্তে কখন কী বলিতেছেন তাহা তিনি নিজেই জানেন না বলিয়া অনেকের অভিমত। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাইতে যাইয়া তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করিতেছেন। অস্থিরতা চলিতেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাশ্মীর ও পশ্চিমবঙ্গেও। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় হইতে যে অস্থিরতা শুরু হইয়াছে, তাহার অবসান এখনো হইতেছে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাবু করিতে হেন কোনো পদক্ষেপ নাই যাহা অনুসরণ করা হয় নাই। আইনের ফাঁকফোকর খোঁজা হইতেছে—তাহাকে কীভাবে সরানো যায়। উপনির্বাচনেও মমতা যাহাতে জিতিয়া আসিতে না পারেন, এই জন্য নির্বাচন আয়োজনে কালক্ষেপণ করা হইতেছে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের উপর যেই সকল অন্যায়-অবিচার করিয়াছিল, যেন তাহারই অনেকটা প্রতিফলন ঘটিতেছে পশ্চিমবঙ্গে। এখন পশ্চিমবঙ্গ ভাগ করিয়া আলাদা দুইটি প্রদেশ গঠনেরও চেষ্টা চলিতেছে।

বিশ্ব জুড়িয়া দেশে দেশে অস্থিরতা ও সহিংসতার মূলে রহিয়াছে নিয়মকানুন না মানিবার প্রবণতা। গায়ের জোরে ক্ষমতায় আঁকড়াইয়া থাকিতে চাওয়া বা ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যত্যয় ঘটানোর পরিণাম কখনো শুভ হয় না। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোগান্তি হয় জনগণের। ক্ষয়ক্ষতি হয় জান ও মালের। রাষ্ট্রীয় নিয়ম মানুষই তৈরি করে। এমনটি নয় যে, তাহা পরিবর্তন করা যাইবে না। কীভাবে সংশোধন করিতে হইবে তাহা সংবিধানেই বলিয়া দেওয়া হয়। সংবিধানে নির্বাচন পদ্ধতি ও একজন নির্বাচিত ব্যক্তির মেয়াদও সুনির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হয়; কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর যেন সুদূর পরাহত। এই সকল দেশে যখনই ইচ্ছামতো সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয়, তখনই দেখা দেয় অস্থিরতা। অ্যাবসুলেট মেজরিটির কারণেও অনেক সময় স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নেওয়া হয়, যাহা কাম্য নহে। বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের কারণে এই সকল দেশ প্রায়শ অস্থিতিশীল হইয়া উঠে। অতএব, পৃথিবীর বুকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখিতে হইলে সংবিধান ও আইনকানুন অনুসরণের কোনো বিকল্প নাই।