সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষ অনুকরণ প্রিয়। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ কাউকে না কাউকে অনুসরণ করে জীবন যাপন করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ পোশাক-আশাকে আবার কেউ কেউ চলাফেরায় কিংবা খাবার-দাবারে বড় বড় সেলিব্রেটিদের অনুসরণ করে থাকে। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের অবাধ বিস্তারের কারণে বৈশ্বিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের তরুণদের মনে দারুণভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ তরুণ পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি অনুসরণ করার চেষ্টায় নিমগ্ন। এই যে অন্যকে অনুসরণ করার প্রচেষ্টা বিশেষত নিজের শিকড়কে ভুলে গিয়ে অন্যের বেশভূষাকে নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা, এটি কিন্তু ভালো কোনো লক্ষণ নয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে তরুণদের মাঝে অশ্লীল, অসামাজিক কিংবা বাজে সংস্কৃতিকে অনুসরণ করার প্রবণতা অনেক বেশি। এই প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শেকড়ের প্রতি, নিজের সংস্কৃতির প্রতি টান কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
দিন দিন আমাদের তরুণরা শেকড়কে ভুলে যাচ্ছে। তবে এর মাঝেও কিছু কিছু তরুণ আছে যারা নিজের শেকড়কে বিশ্বমঞ্চে গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করছে। তেমনি একজন উদ্যমী তরুণী হলেন কিশোয়ার চৌধুরী। তিনি মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ১৩তম আসরে খাঁটি বাঙালি রেসিপি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা সব প্রতিযোগীদের সঙ্গে। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, তার রেসিপি ছিল বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় খাবার এবং বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তার পরিচায়ক পান্তা-ইলিশ ও কাঁচামরিচ। যদিও তিনি আসল ইলিশের পরিবর্তে স্যাডন মাছ ব্যবহার করেছেন, যা অনেকটা ইলিশের মতো। তিনি বাঙালির সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা-ইলিশকে এরকম একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে তুলে ধরেছেন, এটি অবশ্যই আমাদের জন্য দারুণ গর্বের ব্যাপার।
পান্তাভাত, ভাজা ইলিশ মাছ ও শুকনো মরিচ বাঙালির ঐতিহ্যের পরিচায়ক। এই খাবারটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ধনী-গরিব সবার পছন্দ এই খাবার। কিশোয়ার চৌধুরী মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার মঞ্চে এই খাবারটি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন নিজের শেকড় সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও পথ জোগায়। তিনি নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি তাই তিনি এরকম বৈশ্বিক একটি প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালেতে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন।
বর্তমান সময়ে আমাদের আশপাশে লক্ষ করলে দেখা যায় আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে বিশেষ কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের আচার-আচরণ, চলাফেরা, জীবনযাপন ও খাবার-দাবারে এসেছে নানা ধরনের পরিবর্তন। তারা এখন দেশি পোশাকের পরিবর্তে বিদেশি পোশাক পরতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশি বাংলা গান শোনার পরিবর্তে তারা ইংরেজি কিংবা অন্য ভাষার গান শুনতে বেশি পছন্দ করেন। এছাড়া খাবার-দাবার, কিংবা আচার-আচরণে বিদেশিদের অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। তরুণ-তরুণীদের পোশাক-আশাকের দিকে তাকালেই বোঝা যায় আমাদের তরুণরা ভিনদেশি সংস্কৃতির দ্বারা কতটা প্রভাবিত হচ্ছে। তাদের ধারণা, বিদেশিদের মতো পোশাক পরলেই কেবল স্মার্ট ও রুচিশীল ব্যক্তি হওয়া সম্ভব। তারা হয়তো জানেই না, নিজের শেকড়কে ভুলে নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে কখনোই স্মার্ট ও রুচিশীল ব্যক্তি হওয়া সম্ভব নয় এবং সামনে অগ্রসর হওয়াও সম্ভব নয়। আমরা যদি সঠিকভাবে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি, পারিবারিক চালচলন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধারাকে সঠিকভাবে নিজেদের মধ্যে লালন করতে পারি তাহলেই কেবল নিজেদেরকে স্বমহিমায় বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে পারব। পৃথিবীতে যে জিনিস যত বেশি স্বকীয়, সেই জিনিস তত বেশি মূল্যবান। আমরা যদি আমাদের নিজেদের যা আছে সেগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পারি তাহলেই আমরা আমাদের শেকড়কে যথাযথভাবে লালন করতে সক্ষম হব।
আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচিত কিশোয়ার চৌধুরীর ‘শেকড়কে’ আকড়ে ধরার মনোভাব দেখে শিক্ষা নেওয়া। তিনি যেমন নিজের শেকড়কে আঁকড়ে ধরেই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন তেমনিভাবে আমাদের তরুণ সমাজ যদি নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে ও মনে-প্রাণে লালন করতে পারে, তাহলে তারাও সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে পারবে। কেননা শিকড় কিংবা মূল ছাড়া কোনো বৃক্ষ বাঁচতে পারে না। তাই তরুণদের উচিত নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে সত্যিকারের ফলদ বৃক্ষে পরিণত হওয়া। তাহলেই কেবল আমাদের তরুণরা বিশ্ব দরবারে স্বমহিমায় ও সগৌরবে উদ্ভাসিত হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়