কাজী শওকত শাহী
প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ
প্রকাশক :আকাশদীপ প্রকাশনী, যশোর। পরিবেশক :পাঠক সমাবেশ। মূল্য :১২০০ টাকা
সেই চর্যাপদের কাল ও মুলুক থেকে একুশ শতকের সীমানা পর্যন্ত বাংলা গানের একটা ধারাবাহিক ‘রেখাচিত্র’ নিপুণভাবে প্রকাশিত এই বইতে। ‘চর্যাপদ’ বাংলা গানের লিখিত রূপের আবিষ্কার। আধুনিক বাংলা গান—এরই ক্রমধারায় বিকশিত। তবে নতুন নতুন বিষয়-বৈচিত্র্যে আধুনিক গানের জগত্ নির্মিত। এটা আমাদের গর্ব ও অহংকারের ক্ষেত্রভূমি।
এই বইয়ে এসব প্রসঙ্গ ও বিষয় ইতিহাসনির্ভর ভাবনা থেকে কাজী শওকত শাহী একত্রিত করেছেন। মঞ্চগীতি, টপ্পা, পুরাতনী বাংলা গান, গ্রামোফোন কোম্পানির যাত্রা এবং তাদের রেকর্ড করার বিবরণ, চলচ্চিত্রের গান ও রেডিও-র গান কিছুই লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি। এখানেই এ গ্রন্থের বিশেষত্ব। আধুনিক সময়ে সংগীতলোকের পঞ্চপ্রধান-এর সাধনার ফসল আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রাণে এবং জীবনবোধে প্রভাব ফেলে চলেছে সারাক্ষণ। তাঁদের লেখা মনে আলোড়ন তুলছে, হূদয়-জগেক উসকে দিচ্ছে, ভাবনার ক্ষেত্রকে নতুন নতুন সৃষ্টির ফসলে ভরে তুলতে উত্সাহিত করছে বিচিত্র রূপে, তার বিশ্লেষণ এ বইয়ে আন্তরিকতায় প্রকাশিত। গণমানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে যাঁরা গান লেখা, সুর করা, গান গাওয়া, গাওয়া গানের প্রচার করা, আসর সাজিয়ে গানের প্রসার ঘটানো, ‘কলের বাক্স’-এ গানকে রেকর্ড করে ধরে রাখার প্রচেষ্টায় নিবেদিত ছিলেন এবং এখনো রয়েছেন, তাঁদের কর্মপ্রয়াস এ বইতে বিবৃত। আধুনিক গান মানুষের বোধ ও চেতনায় অমিত ঝরনাধারার কল্লোলে নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, প্রাণের গভীরে অসম্ভব সব নতুন প্রাণ-প্রেরণায় এবং ভাবনার অনুরণনে পুষ্ট, আত্মপ্রত্যয়ে দীপ্ত। লেখক সাবলীল ভাষায় এসব কিছুর ওপর সংক্ষেপে অথচ তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা করেছেন।
সংগীত জগতের মানুষেরা ইতিহাসের পাতায়, লেখালেখির জগতে স্থান ও সম্মান পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলিত। কেউ কেউ চির অচেনাই রয়ে যান। অখ্যাত এইসব গুণী মানুষ চেনা-জানার আড়ালেই থাকেন বন্দি। কাজী শওকত শাহী তাঁদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উদ্বুব্ধ। সুরস্রষ্টা ও কণ্ঠশিল্পীর বয়স এবং সময়কে প্রাধান্য দিয়ে ইতিহাসের ধারাবাাহিকতায় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বিখ্যাত ও অখ্যাত শিল্পীগণ এখানে একত্রিত। তাঁদের জীবন, সাধনা, সৃষ্টিকর্ম এবং কর্মের পরিধির তথ্যনির্ভর বিবরণ এ বইয়ে সন্নিবেশিত।
লেখকের এই কাজ এবং ‘সীমানা অতিক্রম’ ভাবনা দেখে মনে হয় ‘আত্মিক চেতনা ও আমরা বাঙালি’ এই অনুভবে তিনি দৃঢ়ভাবে উদ্বুদ্ধ। মূলত অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে লেখক আবিষ্ট। বলা যায়, এ এক অনন্য এবং অসামান্য প্রজ্ঞা ও চিন্তাধারার মুক্ত প্রকাশ ও লিখিত দলিল।
‘যারে চোখে দেখিনি তার কথা শুনেছি’—এমন সব মানুষের ছবি সংগ্রহ করে এই বইয়ের শেষে যুক্ত করেছেন লেখক। ছবি সংগ্রহ দুরূহ কাজ; লেখক সে কাজটি করতেও অবহেলা করেননি। বইয়ের পরিকল্পনা, কাঠামো বিন্যাস ও অঙ্গসজ্জাতে যে মুনশিয়ানা, তা প্রথম থেকে শেষতক উজ্জ্বল, দৃষ্টিনন্দন। লেখককে ধন্যবাদ।
খন্দকার কামরুল ইসলাম