হাইতি :বিদেশি হস্তক্ষেপের কাছে নতজানু স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র

২০০৮ এবং ২০১৬ সালে ভেনিজুয়েলার কর্মসূচি ‘পেট্রোক্যারিব’ হাইতিতে চার শতাধিক প্রকল্পে ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। কিন্তু এর বেশির ভাগ অর্থই আত্মসাত্ করা হয়। এদিকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া আবারও হাইতিতে একটা অস্থিতিশীল রাজনীতির আশঙ্কা করছে

শিফারুল শেখ

 

গত ৭ জুলাই হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভনেল ময়েস নৃশংসভাবে খুন হন। পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ড হাতিবাসীকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। যদিও হত্যাকাণ্ডের পর পরই হাইতির কর্তৃপক্ষ কলম্বিয়ার সাবেক ২০ কমান্ডো ও একটি মার্কিন নিরাপত্তা কোম্পানিকে দায়ী করে। ময়েসের কিছু বিরোধী নেতাও সন্দেহের তালিকায়। তবে হাইতির ইতিহাসে বিদেশি হস্তক্ষেপ একটা ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশি কূটনীতিকদের কোর গ্রুপ বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ক্লদ জোসেফকে নয়, অ্যারিয়েল হেনরিকে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। নিহত হওয়ার মাত্র দুদিন আগে ময়েস হেনরিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করলেও শপথ নিতে পারেননি। এটা ঠিক যে নিজের মেয়াদ বাড়ানোয় প্রেসিডেন্ট ময়েস অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

 

বিদেশি হস্তক্ষেপের ইতিহাস

বিদেশি হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের মূল্য দিতে হচ্ছে হাইতিবাসীকে। ভালোর চেয়ে কপালে খারাপটাই বেশি জুটেছে। প্রেসিডেন্ট ময়েস নিহতের পরদিনই মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছিল, হাইতিতে ইতিমধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। সত্যি তাই-ই ঘটছে। ক্লদ জোসেফ ও অ্যারিয়েল হেনরির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। কিছু মিডিয়া তো বলছে, হাইতিবাসী দেশ শাসনে অক্ষম, তারা দুর্নীতি পরায়ণ ও অযোগ্য। অথচ হাইতিবাসীর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে বিদেশি হস্তক্ষেপ, সেদিকে অনেক মিডিয়া নজর দেয় না।

১৭৯১ সালের ২২ আগস্ট হাইতির আফ্রিকান দাসেরা তাদের মালিকদের ওপর বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং গোটা উপনিবেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। তখন এটা ছিল ফরাসি উপনিবেশ। এক দশকের বেশি সময় কৃষ্ণাঙ্গরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। জ্যাজ্যাকডে সালিনির নেতৃত্বে ১৮০৪ সালের পহেলা জানুয়ারি হাইতি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এটা ল্যাটিন আমেরিকার প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তার পরও ফরাসি চাপ অব্যাহত ছিল। বাধ্য হয়ে হাইতির প্রেসিডেন্ট জ্যাপিয়েরের সরকার স্বাধীনতার বিনিময়ে ফ্রান্সকে অর্থ দিতে রাজি হয়। এরপর থেকে দেশটির অর্থনীতিতে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় তা আজও আছে। স্বাধীনতা ঘোষণার দুই বছর পার হতে না হতেই ডেসালিনি আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এরপর থেকে প্রায় ২০০ বছরের হাইতির ইতিহাস ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও রক্তাক্ত ইতিহাস। ডেসালিনির পর আরও পাঁচ জন রাষ্ট্রপ্রধান আততায়ীর হাতে নিহত হন। হাইতির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে প্রভাবশালী প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রসহ কেউই সম্মান জানায়নি।

কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন হাইতিতে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করার চেষ্টাই করেছে। দেশটির বন্দর ও কাস্টমস হাউজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালালেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রায়ই হাইতির জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনী যেত। ১৯০৪ সালে মার্কিন নৌবাহিনী হাইতিতে গিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৫ লাখ ডলার জব্দ করে নিউ ইয়র্কে পাঠিয়ে দেয়। ঐ বছর যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইতির সরকারের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সরকার সেটি প্রত্যাখ্যান করে।

১৯১৫ সালে হাইতির প্রেসিডেন্ট জ্যাভিল ব্রুনগিলিয়াম নিহত হওয়ার পর তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রোউইলসন দেশটি দখলে নিতে মার্কিন সৈন্য পাঠিয়েছিলেন। ১৯ বছর ধরে অবস্থান করা মার্কিন সরকার হাইতির জিম ক্রোর ওপর বর্ণবাদী বৈষম্য চাপিয়ে দেয় এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা ও হাইতিবাসীর বিরুদ্ধে সহিংস কমকাণ্ড পরিচালনা করে।

১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইতি থেকে চলে গেলেও বিদেশি হস্তক্ষেপ কিন্তু বন্ধ হয়নি। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি দেশটি কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার থেকে গণতন্ত্রে ফিরে আসে। কিন্তু গত তিন দশকের বেশি সময়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে ২০ বার।

১৯৯০ সালে জ্যাবার ট্র্যান্ড অ্যারিস্টাইড প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এক বছরের মধ্যেই অভ্যুত্থানে বিদায় নেন। অভ্যুত্থানে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ প্রশিক্ষিত এবং তাদের অর্থায়নে পরিচালিত গোয়েন্দা সংস্থা অংশ নিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে তিনি মার্কিন সৈন্যদের নিরাপত্তায় দেশে ফেরেন এবং ২০০০ সালে আবার নির্বাচিত হন। ফের তিনি অভ্যুত্থানে অপসারিত হন। তার ধারণা, এবারও ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপ। বারট্র্যান্ড অ্যারিস্টাইডের এই কাহিনীই বলে দেয় হাইতির গণতন্ত্রকে লাইনচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কতটা ভূমিকা ছিল। লসঅ্যাঞ্জেলসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমি মাপিয়েরে বলেন, অন্তত ২০০৪ সাল থেকে হাইতির গণতন্ত্রের অস্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্ব হারানোয় যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। অ্যারিস্টাইডের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর হাইতি আরেকবার বিদেশি সামরিক বাহিনীর কবলে পড়ে। এসময় জাতিসংঘও সেখানে বিদেশি সেনা পাঠায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ২০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে বিদেশি সেনা এবং পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করে দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হয় খুবই সামান্যই। বরং এ সময় কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং যৌন অপরাধ বাড়ে। ডেভিডসন কলেজের আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মামিরাহ প্রসপার বলেন, জাতিসংঘের ১৭ বছরের নিয়ন্ত্রণে আমরা আগের চেয়ে আরো বেশি বন্দুক হাতে পেয়েছি।

 

সহায়তাও যেভাবে ব্যর্থ

গত কয়েক দশকে হাইতির অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১০ সালের ভূমিকম্প এবং কলেরায় দেশটি অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে। ফলে হাইতি বিদেশি সহায়তার একটা মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দেশটিতে ১৩০০ কোটি ডলারেও বেশি মানবিক সহায়তা ও অনুদান আসে। উন্নয়ক প্রকল্পগুলোতে অংশ নেয় মার্কিন কোম্পানিগুলো। এছাড় প্রতিবেশী অন্যান্য দেশ থেকেও তারা ঋণ নেয়। অথচ এতে যেমন পুনর্গঠন খুব একটা হয়নি, তেমনি মানুষের জীবনমানেরও উন্নতি হয়নি।

ভূমিকম্পের পর বিল এবং হিলারি ক্লিনটন উন্নয়ন প্রকল্পের নেতৃস্থানীয় অংশীদার হন। তারা মনে করে ছিলেন, হাইতির উন্নয়নে আন্তর্জাতিক কোম্পনির বিনিয়োগই সহায়তা করতে পারে। এজন্য তারা ‘ক্যারাকোল’ নামের একটি শিল্প পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এক দশক ধরে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর সেই পার্ক আর দেখা যায়নি। বাজারে প্রচলিত আছে, হাইতির বন্দরের উন্নয়নের কাজটিও পরিত্যক্ত হয়েছিল। ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইউএসএইড ৪০৪ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনোমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ এর গবেষক জেক জনস্টনের মতে, মাত্র দুই ভাগ হাইতির সংস্থার কাছে গিয়েছিল। বাকি অর্থ পেয়েছিলেন মার্কিন কন্ট্রাক্টররা। তবে এটা বলা যাবে না যে, এই অর্থ আত্মসাতে হাইতির কর্মকর্তারা অংশ নেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৮ এবং ২০১৬ সালে ভেনিজুয়েলার কর্মসূচি ‘পেট্রোক্যারিব’ হাইতিতে চার শতাধিক প্রকল্পে ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। কিন্তু এর বেশির ভাগ অর্থই আত্মসাত্ করা হয়। এদিকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া আবারও হাইতিতে একটা অস্থিতিশীল রাজনীতির আশঙ্কা করছে।

—তথ্যসূত্র আলজাজিরা