সংখ্যা নহে, বাড়াইতে হইবে মান

বর্তমানে সারা দেশেই করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা এখন আর শুধু বড় বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নাই, ছড়াইয়া পড়িয়াছে প্রত্যন্ত গ্রাম কিংবা মফস্সল এলাকাতেও। এই পরিস্থিতিতে দেশের উপজেলা কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালগুলি রোগীতে পরিপূর্ণ হইয়া যাইবার কথা থাকিলেও বাস্তবে অধিকাংশ হাসপাতাল রহিয়াছে রোগীশূন্য। অথচ বিপরীত দৃশ্য পরিলক্ষিত হইতেছে রাজধানীর সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে। রাজধানীর বেশির ভাগ হাসপাতালই রোগীতে পরিপূর্ণ, যাহার বেশির ভাগই আবার মফস্সলের রোগী। সংখ্যার বিচারে বলিতে গেলে মোট রোগীর ৭০ হইতে ৮০ শতাংশই গ্রাম, মফস্সল কিংবা উপজেলা হইতে আসা। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা না পাইয়া এই সকল রোগী আসিয়া ভিড় জমাইতেছেন রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে। ইহার ফলে রাজধানী ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলিতে যেমন রোগীর চাপ বাড়িয়াছে, তেমনি রাজধানীতে করোনা সংক্রমণও বাড়িয়াছে।

রাজধানীর হাসপাতালগুলিতে মফস্সলের রোগী বাড়িয়া যাইবার কারণ খুঁজিতে হইলে আমাদের তাকাইতে হবে দেশের উপজেলা কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালগুলির চিকিত্সাসেবার সার্বিক পরিস্থিতির দিকে। ইহা সত্য দেশের জেলা, উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়েও হাসপাতাল কিংবা কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়িয়াছে, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হইয়াছে। পাশাপাশি ৩০, ৫০, ১০০ কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালও নির্মিত হইয়াছে উপজেলা পর্যায়ে কিংবা কাজ চলমান রহিয়াছে। প্রশ্ন হইল, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার পাশাপাশি কি চিকিত্সাসেবার মানও বাড়িয়াছে এই হাসপাতালগুলিতে? দুঃখজনক হইলেও সত্যি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হইলেও বৃদ্ধি পায় নাই চিকিত্সাসেবার মান। দেশের অনেক উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা-সরঞ্জাম, যেমন—এক্সরে মেশিন, ইসিজি মেশিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নাই, কিংবা থাকিলেও সেইগুলি পরিচালনা করিবার মতো টেকনিশিয়ান কিংবা প্যাথলজিস্ট নাই। অনেক হাসপাতালে বছরের পর বছর ধরিয়া এই সকল মেশিন পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট পর্যন্ত হইয়া যাইতেছে, অথচ রোগীরা হইতেছেন কাঙ্ক্ষিত সেবা হইতে বঞ্চিত। এমন অনেক হাসপাতাল রহিয়াছে, যেইখানে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ পর্যন্ত নাই কিংবা পানি পরিশোধন করিবার যন্ত্রটিও নাই। রোগীরা এই সকল হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা লইতে গেলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকিবার কারণে তাহাদের বিভাগীয় কিংবা রাজধানীর হাসপাতালে রেফার করিয়া দেওয়া হয়। হাসপাতালগুলির জনবলসংকটের কথা বলিতে গেলে হতাশ না হইয়া পারা যায় না। ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালকে ৫০ কিংবা ১০০ শয্যায় রূপান্তরিত করা হইলেও দেখা যাইতেছে হাসপাতাল চলিতেছে সেই ৩০ শয্যার জনবল লইয়া। অথচ হাসপাতালগুলির এই দুরবস্থার বিষয়টি কেউ তোয়াক্কা করিতেছেন না। এই সকল বিষয় দেখিবার জন্য অর্থাত্ পরিকল্পনা এবং উহা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা রহিয়াছেন, উপজেলা পর্যায়ে মেডিক্যাল অফিসার, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার হইতে শুরু করিয়া জেলায় সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পর্যায়ে পরিচালক, অধিদপ্তরে রহিয়াছেন সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক এবং মহাপরিচালক, মন্ত্রণালয়েও রহিয়াছেন বিভিন্ন স্তরের সচিববৃন্দ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না তাহাদের প্রত্যেকের জন্য বেতন-ভাতা, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, বহির্গমন ভাতা, উচ্চশিক্ষা ভাতা কত কী রহিয়াছে। এই সকল অব্যবস্থাপনা কি তাহাদের গোচরে নাই? এই জন্য কি তাহাদের কোনো জবাবদিহিতা করিতে হইবে না? মাস শেষ হইলে প্রশাসনে নিয়োজিত ১৫ লক্ষাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বরাদ্দ রহিয়াছে নির্দিষ্ট বেতন ভাতা, অথচ কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটিলে প্রথমত দায়ী করা হয় মন্ত্রী কিংবা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে।

দেশের উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলির দুরবস্থার কারণেই মফস্সলের রোগীরা রাজধানীর হাসপাতালগুলিতে ভিড় জমাইতেছে। অনেক সময় আমরা বলিয়া থাকি, দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজাইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অথচ সরকারি হাসপাতালে প্রত্যাশিত চিকিত্সাসেবা না পাইবার কারণে এই সকল বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলিই শেষ ভরসা হইয়া উঠিতেছে। সুতরাং সারা দেশে কেবল হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা শয্যাবৃদ্ধিই নহে, প্রয়োজন হাসপাতালগুলির যথাযথ মান বৃদ্ধি করা। সারা দেশের উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলির চিকিত্সাসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা হইলে জনসাধারণও ভোগান্তি হইতে নিস্তার পাইবে।