কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে চাই সামাজিক বন্ধন

শিশু ও কিশোর অপরাধ আমাদের সমাজের অনেক বড় একটি ব্যাধি। অপরাধী ও তার শাস্তি নির্ধারণের চেয়ে কিশোর অপরাধের পেছনের কারণগুলো নির্ণয় করা অত্যধিক প্রয়োজন। সাধারণত সাত থেকে ১৬ বছর বয়সি  কিশোর ও কিশোরীর দ্বারা সংঘটিত অপরাধই হলো কিশোর অপরাধ। পকেটমার, চুরি, মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রি, সাইবার ক্রাইম, উত্ত্যক্তকরণ, কিশোর গ্যাং, জঙ্গিবাদ ও পতিতাবৃত্তির সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ আরো অনেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। বিভিন্ন ছোট অপরাধ করতে করতে তারা হয়ে যাচ্ছে একসময় বড় বড় অপরাধের দায়ে দোষী। কোনো মানুষই জন্মগতভাবে অপরাধী হয়ে জন্মায় না। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই ভালো-খারাপ দুটো দিক থাকে। পারিপার্শ্বিক অবস্থানের কারণে অনেক শিশু-কিশোর শেষ পর্যন্ত অপরাধীতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অর্থসামাজিক অবস্থানের কারণে অনেক পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোররা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে খুব দ্রুতই জড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে অনেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিও পার করতে পারে না। তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে তারা কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আজকাল দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু ছাড়াও অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও জড়িয়ে পড়ছে কিশোর অপরাধে।

ট্রাভিস হিরস্কি তার সামাজিক বন্ধন থিউরিতে শিশু-কিশোরদের অপরাধের পেছনে চারটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন এবং বলেছেন, এগুলোর অভাবে অপরাধপ্রবণতা দেখা দেয়। তা হলো আনুগত্য বা সংযুক্তি, প্রতিশ্রুতি, সম্পৃক্ততা ও বিশ্বাস। এই চারটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে শিশু ও কিশোরদের সুন্দর ও অপরাধহীন পথচলায়। পিতা-মাতা, শিক্ষক এবং বন্ধুরা একজন শিশু ও কিশোরের কাছের ও প্রিয় মানুষ হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের সঙ্গে সংযুক্ততার অভাবে অনেক শিশু-কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। হিরস্কির মতে, পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো বন্ধন শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখে। কিন্তু অনেক সময় পারিবারিক বন্ধনের অভাবে বিভিন্ন রকমের কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পরিবারের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পারার অভাবে তাদের মধ্যে সচেতনতাবোধ গড়ে তোলা যায় না এবং তারা তখন হয়ে ওঠে অপরাধী। যার ফলে ঘটে ঐশীর মতো লোমহর্ষক ঘটনা। প্রতিশ্রুতির অভাবেও শিশু ও কিশোররা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পরিবার, বিদ্যালয় ও বন্ধুরা আমাদের মধ্যে নতুন এবং ভালো কিছু করার আকাঙ্ক্ষা গড়ে তোলে। পরিবারের কাছে ভালো কিছু করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে কিন্তু কখনো যদি সফল না হয় পরিবার ও শিক্ষকদের উচিত উত্সাহ দেওয়া। তাদের তিরস্কার করার ফলে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ জেগে ওঠে এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সামাজিক কার্যক্রমে উত্সাহ হারিয়ে ফেলে।

বিভিন্ন ভালো ও শিক্ষামূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভাবে শিশু-কিশোররা অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা, গঠনমূলক ও বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম করার মাধ্যমে তাদের ব্যস্ত রাখা যায়। এর ফলে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং, টিকটক ও বিভিন্ন ক্ষতিকর গেমস থেকে তারা দূরে থাকবে। বিদ্যালয়ের বাইরেও নাচ, গান আবৃত্তি, ছবি আঁকা, কেরাতে, বির্তকের মতো বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে পরিবার। যাতে শিশু-কিশোদের গঠনমূলক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ধর্মীয়, সামাজিক এবং আইনের প্রতি বিশ্বাসের অভাবেও বিভিন্ন অপরাধের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি মানুষই কোনো না কোন ধর্মের অনুসারী। আর প্রতিটি ধর্মই মানুষের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-খারাপ আলাদা করতে শেখায়। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবেও অনেক শিশু-কিশোর অপারাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ছোট ছোট শিশু ও কিশোরদের ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ও গোঁড়ামির মাধ্যামে কেউ কেউ তাদের জঙ্গিবাদের সবক দেয় এবং এর সঙ্গে তাদের সমপৃক্ত করে তোলে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে আমাদের দাঁড়ানো প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারি এনজিওদের আরো সহযোগিতার হাত বাড়ানো খুবই দরকার। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থান করে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এর ফলে কিছুটা হলেও কিশোর অপরাধ হ্রাস পাবে। তাদের সুন্দর মানসিক বিকাশে আমাদের অবিরত সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা