করোনা মহামারী চলাকালে বিশেষ করে লকডাউনের সময়ে ডিজিটাল কমার্স বা অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয়ের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাঁরা কোনদিন ইন্টারনেটে কেনাকাটার কথা কখনও চিন্তা করেননি, তাঁরাও এ সময়ে ডিজিটাল কমার্স ব্যবহার করেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে কেনার একটা অভ্যেস তৈরি হয়েছে জনগণের। যেকোন ব্যবসায়েই গ্রাহক অধিগ্রহণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই দুঃসময়ে নতুন ভোক্তা তৈরি হওয়াটা যেন শাপে বর হয়েছে ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে! ভোক্তাদের এই অনলাইনে কেনাকাটার ধারা যে ভবিষ্যতে শুধু চলমান থাকবে তা’ নয়, বরং প্রসারিতও হবে। অর্থাত্, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি অন্যান্য দ্রব্যাদি, টুকিটাকি ইত্যাদি কেনার চলও শুরু হবে। তাই ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের জন্য বর্তমান সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং একই সাথে ভোক্তার আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং এই ডিজিটাল ব্যবসায়ে শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১’ জারি করা হয়েছে। এর ফলে যে শুধু প্রতিযোগিতামূলক বাজারই সৃষ্টি হবে তা’ না, একই সাথে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হবে।
ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ভোক্তার আস্থা অর্জন করা। আর ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারলেই এই আস্থা অর্জন সম্ভব। যেসব পদক্ষেপ নিলে ভোক্তা-অধিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে, তা’র মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওয়েবসাইটে পণ্য বা পরিষেবার সঠিক বিবরণ এবং শর্তাবলী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত রাখা। একই সাথে পণ্য ও মূল্য ফেরত্, পরিবর্তন ও সরবরাহের সময়সীমা ইত্যাদি বিষয়াদির উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ডিজিটাল কমার্স ব্যবহার করে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা করার একটা প্রবণতা দেখা গেছে ইদানিং। এই ধরণের পদ্ধতি বা স্কীমগুলো সাধারণত খুব আকর্ষণীয় হয়ে থাকে, যাতে প্রচুর সংখ্যক গ্রাহক এর সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং এতে বিনিয়োগ করা শুরু করে। অনেকটা জুয়া খেলার মত বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢালতেই থাকে; কিন্তু বেশীভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরণের ব্যবসায়ের পরিণতি খুব একটা আশানুরূপ হয়না বিনিয়োগকারীদের জন্য। এই মডেল ডিজিটাল কমার্সের বেলায় ব্যবহূত হতে থাকলে কোন না কোন সময়ে গ্রাহকরা প্রতারিত হবে এবং তা’র প্রভাব পুরো ইন্ডাস্ট্রির উপর পড়বে।
ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা এখন অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। গ্রাহকের ব্যক্তিগত কী কী তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সেই তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং কোথায় তা’ ব্যবহূত হবে, এসবের পূর্বানুমতি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে এই নির্দেশনায়। সরকারের আইসিটি বিভাগ ও বেসিস যে ডাটা প্রাইভেসি নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে, তা’র সাথে এ বিষয়ে সামঞ্জস্য থাকা একান্ত প্রয়োজন।
লটারির প্রলোভন দেখিয়ে কোন ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ী যাতে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না করতে পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। গিফট বা ক্যাশ ভাউচার সারা পৃথিবীতেই বেশ জনপ্রিয়। এই ভাউচারগুলো যেহেতু প্রি-পেইড, তাই বিক্রেতারাও তা’দের রেভিনিউ আয় বাড়াতে এই ভাউচার বিক্রীকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এধরণের ব্যবসা পরিচালনা, মার্কেটিং কার্যক্রম বা সেলস প্রমোশন ইত্যাদি কাজে যদি কথায় কথায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়, তা’হলে ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই ভাউচার ইস্যু করার ক্ষেত্রে কোন জটিলতা থাকাটা অবাঞ্ছনীয়। তবে লয়েলটি কার্ডের ব্যাপারে কিছু বলা নেই এখানে। যেহেতু এই লয়েলটি কার্ডগুলো অর্থের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, সেহেতু এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অনুমোদন লাগবে কিনা তা’ স্পষ্ট করা দরকার।
ডিজিটাল কমার্স ওয়েবপেজে বা ফেসবুক পেজে সকল শর্তাবলী আবশ্যিকভাবে বাঙলায় ও প্রয়োজনে অন্য ভাষায় লিপিবদ্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এইসব শর্তাবলী যাতে প্রচলিত আইন বা বিধির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকেও মনোযোগী হতে হবে। এই শর্তাবলী গ্রাহক মেনে নিল কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কিছু কিছু ওয়েবসাইট ‘ব্রাউজ র্যাপ’ পদ্ধতিতে এই সম্মতি নিয়ে থাকে, অর্থাত্ গ্রাহক ঐ ওয়েবপেজ দেখা বা ব্রাউজ করা মানেই হলো তা’র ঐ পেজে লিখিত শর্তাবলীর প্রতি সমর্থন রয়েছে। এধরণের ‘সম্মতি’ প্রদান ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়, কারণ আমাদের দেশে গ্রাহকরা এখনও সচেতন হয়ে ওঠেননি। তাই সকল সম্মতি ‘ক্লিক র্যাপ’ পদ্ধতিতে নেওয়ার বিধান রেখে চেকবক্সের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রাহক পেজের কোন নির্দিষ্ট স্থানে ক্লিক করে তা’র সম্মতি প্রদান করবেন।
ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এ বলা হয়েছে, বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই এদেশে নিবন্ধিত হতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। এই নির্দেশনাটির ব্যাপারে যথেষ্ট স্পষ্টিকরণ প্রয়োজন।
পরিচালনা নির্দেশিকায় মেধাস্বত্ব যথাযথভাবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নকল পণ্য পরিবেশন করলে গ্রাহকের বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করার সম্ভাবনা থাকে। অনেকে জাল বা নকল পণ্যকে ‘রেপ্লিকা’ হিসাবে চিহ্নিত করে খোলাখুলি ভাবেই বিপণন করে যাচ্ছে। ভেজাল পণ্য প্রদর্শন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তবে এক্ষেত্রে দায় মার্কেটপ্লেস না বিক্রেতা নাকি উত্পাদনকারী বা আমদানীকারক কার উপর বর্তাবে, তা’ বলা হয়নি। যদিও নির্দেশনায় বলা আছে, মার্কেটপ্লেসের সাথে বিক্রেতার ভিন্নতর চুক্তি থাকলে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তথাপি মার্কেটপ্লেসে কোন জাল, নকল বা ভেজাল পণ্য পরিবেশিত বা বিক্রিত হলে গ্রাহকের অভিযোগ মার্কেটপ্লেসকেই সমাধান করতে হবে, এই মর্মেই নির্দেশনা থাকা উচিত্। অর্থাত্, ক্রেতা যার কাছ থেকে পণ্যটি কিনবেন বা যাকে মূল্য পরিশোধ করবেন, তা’কেই এর প্রতিকার এবং নিষ্পত্তি করতে হবে।
৪৮ ঘন্টার মধ্যে যে সকল পণ্যের ডেলিভারী প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না, সে সকল পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যের ১০%-এর বেশী আগাম নেওয়া যাবে না। যদিও আসন্ন এসক্রো সার্ভিসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মূল্যই গ্রহণ করা যাবে। এই বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু ব্যবসায়ের ক্যাশ-ফ্লোর কথা চিন্তা করে এই অগ্রীমের পরিমাণ ডেলিভারী সময়ের সাপেক্ষে নিরুপণ করা যেতে পারে।
পণ্যের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধিত হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে সর্বোচ্চ ৫ দিন এনং ভিন্ন শহরে অবস্থান করলে সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারী প্রদান করতে হবে। সেবার মান নিশ্চিত করা ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের দিক থেকে নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ।
প্রতিটি ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানে একজন কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যিনি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন করবেন। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই বিধান প্রতিপালন করা যথেষ্ট ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য হবে। তাই এটিকে বাধ্যতামূলক না করে উত্সাহিত করা যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানের একজনকে এই সকল দপ্তর ও সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধনের জন্য মনোনীত করার বিধান থাকতে পারে।
বিক্রেতা কোন কারণে পণ্য বা সেবা সরবরাহ করতে সক্ষম না হলে পরিশোধিত মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ ক্রেতাকে ফেরত্ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিক্রেতার জন্য ডেলিভারীর সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও ক্রেতা যদি কোন কারণে ডেলিভারী নিতে অস্বীকৃতি জানান বা ডেলিভারী পয়েন্ট থেকে পণ্য গ্রহণ না করেন, সেক্ষেত্রে ক্রেতার কী দায় থাকবে, এ বিষয়ে কোন আলোকপাত করা হয়নি। এক্ষেত্রে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে দুই ধরণের রীতি মেনে চলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো সাবস্ট্যানটিভ, যেমন শালীনতা, বৈধতা এবং সত্যবাদিতা বজায় রাখা; শিশু-কিশোরদের কাছে বিপণন না করা; শর্তাবলীতে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম-অধিকার রাখা; দায় বর্জন না করা ইত্যাদি বিষয়ে মনযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
দ্বিতীয়টি হলো প্রোসিডিউরাল, যেমন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্রেতাকে অর্ডার বাতিল করার ক্ষমতা প্রদান করা; কোন পণ্য বা পরিষেবায় বিশেষ ছাড় থাকলে তা’র সময়সীমা উল্লেখ করা এবং সময়ের আগেই পণ্য শেষ হয়ে গেলে ‘রেইন-চেক’-এর ব্যবস্থা রাখা যাতে ক্রেতা স্টক আসার পরও বিজ্ঞাপনে থাকা ছাড়ে ক্রয় করতে পারে; ঘোষিত মূল্যের অধিক কোনভাবেই দাবী না করা, এমনকি যদি ঘোষিত মূল্যটি ভুলবশত হয়ে থাকে ইত্যাদি।
ডিজিটাল কমার্স ব্যবসায়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু নিরপেক্ষ রিভিউ সাইট থাকা প্রয়োজন, যেখানে ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা লেখা থাকবে। এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে বিক্রেতাকে রেটিং করা হবে। এতে গ্রাহকের ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।
সর্বোপরী মনে রাখতে হবে, সকল নীতিমালা ও নির্দেশিকা ভোক্তা অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকলেও তা’ যদি ব্যবসা-বান্ধব না হয়, তা’হলে এই খাতের উন্নতি সম্ভব হবে না। আইনের মাধ্যমে যেমন গ্রাহকের সুবিধা রক্ষা করা জরুরি, একইভাবে উদ্যোক্তার লাভও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত শৃঙ্খলাবদ্ধতা ব্যবসায়ের পরিবেশ, কৌশল, পরিচালনা ও সৃজনশীল বিপণনকে বাধাগ্রস্থ করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইন ও বিধানের উপযুক্ত বাস্তবায়ন। ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০২০ (সংশোধিত) ও ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রেখে এর সঠিক প্রয়োগ করলেই অপার সম্ভাবনাময় এই ডিজিটাল কমার্স খাতে আস্থা তৈরি হবে এবং উদ্যোক্তাগণ এই খাতে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।
লেখক :সভাপতি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সাভির্সেস (বেসিস)