গ্রিক পুরান : উড়ন্ত ঘোড়া পেগাসাস

 

গ্রিক উপকথার একটি অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর প্রাণী। পেগাসাস মূলত একটি সাধারণ ঘোড়া, কিন্তু তার পাখির মতো পালকযুক্ত পাখা রয়েছে। ছেলেবেলায় বাংলা রূপকথায় আমরা যে পঙ্খীরাজ বা পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা শুনে এসেছি সেটি সম্ভবত পেগাসাস থেকেই অনুপ্রাণিত। দুধের মতো সাদা রঙের পেগাসাস একটি ঐশ্বরিক ঘোড়া, দেবতাদের বাহন হিসেবে একে দেবঘোড়াও বলা হয়। একটি আজব ঘটনার মধ্য দিয়ে জন্ম হয় এর। গ্রিক পুরানের দানবী মেডুসা এবং সমুদ্রের দেবতা পসাইডনের সন্তান পেগাসাস। মেডুসা দানবীয় একটি চরিত্র, যার মাথায় চুলের পরিবর্তে ছিল সাপ! শত শত ভয়ংকর সাপ তার মাথায় কিলবিল করত। মেডুসা দেখতে এতটাই কুিসত এবং বীভত্স ছিল যে, কেউ যদি তার চোখের দিকে তাকায় তবে পাথরে পরিণত হয়। একবার তরুণ গ্রিক বীর পার্সিয়াস বীভত্স দানবী মেডুসাকে হত্যা করার এক কঠিন সংকল্প হাতে নেয়। অনেক বছর ধরে মেডুসাকে খুঁজে বেড়ায় পার্সিয়াস। অবশেষে একদিন সে মেডুসাকে খুঁজে পায়, মেডুসা তার দুই বোনকে নিয়ে বেশকিছু পাথুরে মূর্তির মাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এই পাথুরে মূর্তিগুলো হলো সেইসব বীরের মূর্তি, যাদেরকে মেডুসা তার ভয়ংকর চাহনি দিয়ে পাথর বানিয়ে ফেলেছিল। তবে পার্সিয়াস আগে থেকেই মেডুসার এই ভয়ংকর রূপের ব্যাপারে জানত, দেবতারা তাকে মেডুসা বধের কৌশল জানিয়ে দিয়েছিল। পার্সিয়াস সরাসরি মেডুসার দিকে না তাকিয়ে মসৃণ এক ঢালের মাধ্যমে মেডুসাকে দেখতে থাকে, ফলে মেডুসার জাদু পার্সিয়াসকে বশ করতে পারে না। পার্সিয়াস বীরত্বের সঙ্গে তার কাস্তে দিয়ে মেডুসার ভয়ংকর আর বীভত্স মাথাটা কেটে ফেলে। মেডুসার কাটা মাথা দিয়ে তখন গলগল করে রক্ত বের হতে থাকে, আর সেই রক্ত থেকেই জন্ম নেয় পেগাসাস আর তার মানব ভাই খ্রিসাওর। কবি হেসোয়েডের মতে, পেগাসাস নামটি এসেছে pegai (ঝরনা) এবং Okeanos (যে স্থানে পেগাসাসের জন্ম হয়েছিল) এই শব্দ দুটি থেকে। আরেকটি সূত্রমতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা Luwian-এ pihassas মানে বিদ্যুত্, আর সেখান থেকেই পেগাসাস নামের উত্পত্তি। বলা হয়ে থাকে দেবতারাজ জিউস পেগাসাসকে করেছিলেন বজ্র আর বিদ্যুতের বাহক।

মেডুসাকে হত্যা করার ফলে তার বাকি দুই বোন ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পার্সিয়াসকে ধাওয়া করে। পার্সিয়াস তখন পেগাসাসের পিঠে চড়ার অনুমতি চায়, পেগাসাস তাকে পিঠে তুলে নিয়ে আকাশে উড়ে যায় আর দুজনই নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। সাধারণ মানুষের হাতে সহজে বশীভূত হতো না পেগাসাস। শুধু দুজন বীর পেগাসাসকে বশীভূত করে পিঠে উঠতে পেরেছিল, পার্সিয়াস এবং বেলেরোফন। পার্সিয়াসের মৃত্যু পর্যন্ত পেগাসাস তার সেবা করেছে। অন্যদিকে গ্রিক বীর বেলেরোফন ছিল সমুদ্রের দেবতা পসাইডনের পুত্র। একবার ভবিষ্যত্দ্রষ্টা পলিআইডোস বেলেরোফনকে অ্যাথেনা দেবীর মন্দিরে গিয়ে ঘুমানোর নির্দেশনা দেয়। রাতের বেলা দেবী অ্যাথেনা বেলেরোফনের কাছে আসেন এবং তাকে একটি সোনার লাগাম উপহার দেন। বেলেরোফন পরদিন সকালে সেই লাগাম হাতে নিয়ে পেগাসাসকে খুঁজতে বের হয়। কথিত রয়েছে, পার্সিয়াসের মৃত্যুর পর পেগাসাস  মিউজদের (নয়জন বোন—যারা শিল্পকলা, সংগীত এবং বিজ্ঞানের দেবী) বাসস্থান হেলিকন পর্বতে যায়। সেখানে যে পবিত্র ঝরনাটি মিউজদের কাজ করার অনুপ্রেরণা দিত সেটি শুকিয়ে গিয়েছিল। পেগাসাস তার খুর দিয়ে পাথরের ওপর এত জোরে আঘাত করে যে, পাথর ভেঙে ঝরনার সৃষ্টি হয়। পেগাসাস যখন মিউজদের পবিত্র ঝরনা পিয়েরিয়ান থেকে পানি খাচ্ছিল তখন বেলেরোফন তাকে পাকড়াও করে আর ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করতে সক্ষম হয়। পেগাসাসে চড়ে বেলেরোফন কুখ্যাত দানব কাইমেরাকে হত্যা করতে রওনা হয় এবং বিখ্যাত সেই যুদ্ধে জয়ী হয়।

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর গ্রিক মৃিশল্পে, বিশেষ করে করিন্থ শহরের পণ্যসামগ্রীতে পেগাসাসের অনেক প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে করিন্থের মুদ্রায়ও পেগাসাসের নকশা খোদাই করতে দেখা গেছে। রোমান চিত্রকলায়ও বেলেরোফন আর পেগাসাসের কাহিনি অনেক জনপ্রিয় একটি বিষয় ছিল। মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ পর্যন্ত পেগাসাসকে ভাবা হতো জ্ঞান আর খ্যাতির প্রতীক। রেনেসাঁ আমলের অনেক ভাস্কর্যে পেগাসাসকে পাওয়া যায়। যদিও গ্রিক পুরাণে পেগাসাসের চরিত্রটির ব্যাপ্তি খুব ছোট, তবু এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র। প্রাচীন গ্রিসের মৃিশল্প থেকে শুরু করে আজকালকার কর্পোরেট লোগোতে পর্যন্ত পেগাসাসের অবয়ব দেখা যায়।

এইচ এম নাজমুল আলম