দর্শকহীন স্টেডিয়ামে টোকিও অলিম্পিকসের জমকালো উদ্বোধন

 

১০৫ কোটি ডলারে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকসের জন্য তৈরি হয়েছিল স্টেডিয়ামটি। ৭০ হাজার দর্শক একসঙ্গে বসে খেলা দেখতে পারবেন। কিন্তু সেই স্টেডিয়ামে গত বছর স্থগিত হওয়া অলিম্পিকসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঠিকই হলো, তবে গ্যালারি ছিল দর্শকশূন্য। সবই ঘটেছে করোনা মহামারির জন্য। আগামী ৮ আগস্ট গেমসের সমাপ্তি ঘটবে।

গতকাল শুক্রবার জাপানের সম্রাট নারুহিতো টোকিও ২০২০ অলিম্পিকসের উদ্বোধন করেন। পরিবারের সদস্য ছাড়া তিনি একাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন। এবারের ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত’ অলিম্পিকসে ৯৫০ জন অতিথি অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে ৮০০ জন বিদেশি এবং ১৫০ জন জাপানের। মার্কিন ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। জিল বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই শতাধিক অ্যাথলেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে এটাই অলিম্পিকসে তার প্রথম উপস্থিতি নয়। ২০১০ সালে সেকেন্ড লেডি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে তিনিও অলিম্পিকসে গেমসে উপস্থিত ছিলেন। টোকিওতে অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন সাঁতারু আরিফুল ইসলাম। বাংলাদেশ থেকে ধাপে ধাপে ছয় জন অ্যাথলিট বিভিন্ন ইভেন্টের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে অলিম্পিকস গেমসে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এবারের অলিম্পিকসে শরণার্থীদের একটি দলও অংশ নিচ্ছে।

করোনার ঊর্ধ্বগতির মধ্যে উদ্বোধন

করোনা মহামারি কারণে বহু মানুষকে হারিয়েছে এই পৃথিবী। তাদের উদ্দেশে সমবেদনা জানিয়ে শুরু হয় এবারের অলিম্পিকসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। নীরবতা পালন করা হয় তাদের জন্য। ফেসমাস্ক এবং জীবাণুবিহীন পতাকা এবার গুরুত্ব পেয়েছে। ভিলেজের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ায় শেষ মুহূর্তেও অলিম্পিকস বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল আয়োজক প্রধানের কথায়। তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আপাতত স্বস্তি দিল ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে। জাপানের অক্ষর অনুযায়ী মার্চপাস্টে অংশ নেয় দেশগুলো। উদ্বোধনের দিনে টোকিওর আকাশে ১ হাজার ৮০০ ড্রোন দিয়ে গ্লোব তৈরি করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি জাঁকজমকপূর্ণ হলেও আশানুরূপ হয়নি।

মহামারির কারণে অলিম্পিকস এক বছর পিছিয়েছে। ফলে ২০৭টি দেশের ১১ হাজার ৩০০ অ্যাথলেট প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের জন্য বাড়তি এক বছর সময় পেয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই এই অলিম্পিকস অতীতের যে কোনো গেমসের থেকে ভিন্ন। রাজধানী টোকিওতে এখন কোভিড জরুরি অবস্থা চলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার নতুন কোভিড রোগী শনাক্ত হচ্ছে টোকিওতে।

অ্যাথলেট এবং তাদের সঙ্গে আসা প্রশিক্ষক বা কর্মকর্তাদের ওপরও নানা ধরণের বিধিনিষেধ রয়েছে। খাওয়ার সময়, অনুশীলনের সময়, ঘুমানোর সময় বা মূল প্রতিযোগিতার সময় ছাড়া তাদের সবাইকে সবসময় মাস্ক পরে থাকতে হবে। একজনের কাছ থেকে অন্যজনকে যতটা সম্ভব দূরত্ব রাখতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রত্যেককে প্রতিদিন কোভিড পরীক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও অলিম্পিককে নিশ্ছিদ্র করা সম্ভব হয়নি। খেলা শুরুর আগেই গেমসে ভাইরাস ঢুকে পড়ে। গতকাল আরও নতুন ১৬ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত অলিম্পিক সংশ্লিষ্ট ১০৬ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে টোকিওতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ জন অ্যাথলেট।

জাপানে অলিম্পিকসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। সাধারণ মানুষের দাবি এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করার। তাদের আশঙ্কা এই প্রতিযোগিতা করোনা সংক্রমণ আরো বাড়িয়ে দেবে জাপানে। আয়োজকরা আশা করছেন, এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর যখন বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিযোগিতা শুরু হবে তখন এবারের অলিম্পিকস নিয়ে সমালোচনাগুলো কমে আসবে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিকস কমিটির সভাপতি টমাস বাখ বলছেন, স্টেডিয়ামে ঢোকার অনুভূতি হবে আনন্দের এবং স্বস্তির। তবে এত আশঙ্কার মধ্যেও আশা জাগিয়েছে বিশ্বখ্যাত সংগীত শিল্পী জন লেননের ‘ইমাজিন’ নামের গানটি। কারণ কল্পনাই মানুষকে একত্র করতে পারে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বে সামনের অলিম্পিকস দর্শক ভর্তি গ্যালারিতেই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা সবার।

এবারে নতুন যা

অলিম্পিকের পরিধিতে কোনো আপোষ করা হচ্ছে না। বরঞ্চ নতুন কিছু খেলা এবং ইভেন্ট এবার যোগ হয়েছে। ৩৩টি ভিন্ন খেলায় রেকর্ড ৩৩৯টি মেডেল ইভেন্ট হবে। পাঁচটি নতুন খেলা এবং ৩৪টি নতুন ইভেন্ট এই অলিম্পিকে যোগ হয়েছে। নতুন এই পাঁচটি খেলা হচ্ছে কারাতে, স্কেট-বোর্ডিং, ক্লাইম্বিং, বেসবল-সফট-বল এবং সার্ফিং। বেসবল এবং সফট বল সেই অর্থে একদম নতুন নয়, তবে ২০০৮ সালে বেইজিং গেমসের পর এটি আর হয়নি। বক্সিং, সাইক্লিং, রোয়িং বা নৌকা বাইচ এবং সাঁতারে বেশ কিছু নতুন ইভেন্ট যোগ হয়েছে। সেইসঙ্গে কিছু ইভেন্টে এবার নারী-পুরুষ একসঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে যেমন ৪০০ মিটার মিশ্র রিলে সাঁতার এবং মিশ্র ট্রায়াথলন। আইওসি বলছে, নতুন প্রজন্মের দর্শক টানতে নতুন কিছু ইভেন্ট এবং নারী-পুরুষের মিশ্র ইভেন্ট যোগ করা হয়েছে। প্রতিযোগীদের ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশই নারী যেটা একটি রেকর্ড।

বাতিল মোবাইল দিয়ে মেডেল

এবারের অলিম্পিকে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা হয়েছে। যেমন, মেডেল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে নষ্ট এবং বাতিল মোবাইল ফোন। অলিম্পিক মশাল তৈরি হয়েছে ২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্পের পর অস্থায়ী বাসস্থানের নির্মাণ কাজের পর ফেলে দেওয়া টুকরো আ্যাালুমিনিয়াম দিয়ে। টোকিও অলিম্পিক আয়োজনে যে বিদ্যুত্ ব্যবহার হবে তা উত্পাদিত হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পুড়িয়ে। অলিম্পিক আয়োজনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও খরচ ২২ শতাংশ বেড়েছে এক বছর দেরি করার জন্য। —সিএনএন ও বিবিসি