চামড়াশিল্পের সুদিন ফিরে আসুক

জাতীয় অর্থনীতিতে ২০ শতকের শুরু থেকেই অসামান্য অবদান রেখে আসছে চামড়াশিল্প। কাঁচা চামড়া এবং সেমিপাকা চামড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানিসামগ্রী। গত দুই দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য আধুনিকায়ন ঘটেছে এবং এর ফলে বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়ার তৈরি সামগ্রী প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করেছে। অধিকাংশ চামড়া এবং চামড়াসামগ্রী রপ্তানি করা হয় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ানে। এসব রপ্তানির মূল্য সংযোজনের শতকরা ৮৫ ভাগ স্থানীয় এবং ১৫ ভাগ বিদেশি। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরো ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির মধ্যে চামড়া খাতের অবধান ৪ শতাংশ যা দেশের মোট জিডিপির ০.৫ শতাংশ। চামড়া খাত বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণ, মূল্য সংযোজন নিরিখে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

২০ শতকের ৪০-এর দশকে রণদা প্রসাদের প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশে একটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে  ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে তত্কালীন সরকার কর্তৃক ঘোষিত এক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ঢাকার হাজারীবাগে ট্যানারিশিল্প স্থাপিত হয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে চামড়াশিল্প দেশীয় অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখে গিয়েছে। ৯০ দশকের পরবর্তী সময়ে ওয়েট উত্পাদনের সীমিত পরিসর পেরিয়ে স্কাড ও ফিনিসড্ লেদার জুতা, ব্যাগ প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের চামড়াজাত পণ্য উত্পাদনের মধ্য দিয়ে চামড়াশিল্পের বৈচিত্র্য প্রকাশ পায় বিশ্ব বাজারে। ২১ শতকের শুরুতে চামড়াশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে যা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষমতা অর্জন করে। এ শিল্পকে যুগোপযোগী ও উন্নয়ন ঘটাতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতিমালা প্রণয়ন করে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য হতে মোট আয় হয় ১১২ কোটি মার্কিন ডলার। যথাযথ ব্যবস্থাপনায় চামড়াশিল্প প্রক্রিয়াকরণে যুগোপযোগী পন্থা অবলম্বন করায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য অধিক হারে উত্পন্ন হয় এবং সেগুলা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয় বিশ্বের অন্য দেশগুলো। তবে বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়ে ১১১.০৪ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। পরের অর্থবছরে পুনরায় এ খাতের মোট আয় বৃদ্ধি পেয়ে ১১৬.৯৫ কোটি মার্কিন ডলার যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬.২৯ শতাংশ বেড়ে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার হয়।

কিন্তু এর পর থেকেই যেন চামড়াশিল্পে মন্দার উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং এ খাতের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে ১২.০৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১০৮.৫৫ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ শিল্পের রপ্তানি আয় আরো কমে ১০১.৯৭ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসে যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় ৬.০৬ শতাংশ কম। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে চামড়াশিল্পের রপ্তানি আয় অধিক হারে হ্রাস পেয়ে ৭৯.৬১ মার্কিন ডলারে নেমে আসে যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এভাবে ক্রমান্বয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়াশিল্পের রপ্তানি আয় হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণগুলো হলো—চামড়া ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এর মধ্যে কাঁচা চামড়ার দাম হ্রাস পাওয়া, চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহূত কেমিক্যাল ও লবণের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে দুর্ভোগ, ট্যানারির অবকাঠামোগত দুর্বলতা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক জরিমানার ভার গ্রহণ করা ইত্যাদি চামড়াশিল্পের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী হওয়ার পেছনে জড়িত। এই দুর্ভোগের মধ্য দিয়েই নতুন বাধা হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় পরিস্থিতি।

চামড়াশিল্পের প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি কাঁচামাল অর্থাত্ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয় পবিত্র ঈদুল-আজহার কোরবানির পশুর চামড়া থেকে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে পারলে পূর্ববর্তী অর্থবছরের থেকেও বেশি রপ্তানি আয় করতে সক্ষম হবে চামড়াশিল্প। স্বল্প সময়ে সুপরিকল্পিতভাবে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য অবশ্যই কিছু পন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। চামড়াশিল্পের সুদিন ফিরে পেতে অবশ্যই চলমান লকডাউন পরিস্থিতিতে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। যথা-

চামড়া সংগ্রহে সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উত্পাদনে উদ্যোক্তাদের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। চামড়াশিল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং চামড়াশিল্পের ট্যানারিগুলোকে পরিবেশসম্মত অবস্থায় রাখতে হবে যাতে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা ও চামড়াশিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকার চামড়াশিল্পের পুনরুদ্ধারে করোনাকালীন বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে। কাঁচা চামড়ার নায্যমূল্য দিতে হবে যাতে জনসাধারণের কাছ থেকে সহজেই চামড়া সংগ্রহ করা যেতে পারে। অনুন্নত অঞ্চল যেখানে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চামড়া ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়