যে শহিদ মিনারে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিবাদী গান গাইতেন, সেই শহিদ মিনার থেকেই শেষ বিদায় জানানো হলো গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীরকে। গতকাল শনিবার ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যেই ভালোবাসা ও ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয় এই জনপ্রিয় শিল্পীকে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দুই দফা জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান এ শিল্পী। বেলা ১২টার পর লাল-সবুজ পতাকায় আবৃত করে স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ফকির আলমগীরের মরদেহ নিয়ে আসা হয় শহিদ মিনারে। গুণিজনদের মুখে উচ্চারিত হয় স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধ এই শিল্পীর অবদানের কথা, সংগঠক হিসেবে কীর্তির কথা। তারা বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন তিনি। গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিভিন্ন সংগীত সংগঠন। যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি গণমানুষের জীবনচিত্রকে উপজীব্য করে গেয়েছেন অসংখ্য কালোত্তীর্ণ গান। তার গাওয়া গানের সুরে এবং বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে তার কাজ দিয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই শিল্পী।
শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে খিলগাঁওয়ের পল্লীমা সংসদে ফকির আলমগীরের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই শিল্পীকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এরপর শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ জোহর খিলগাঁওয়ের মাটির মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা হয়। এরপর খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে সমাহিত করা হয় গানে গানে গণমানুষের কথা বলা এই গণসংগীত শিল্পীকে।
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে শিল্পীকে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শিল্পীর সহধর্মিণী সুরাইয়া আলমগীর, ছেলে মাশুক আলমগীর ও ভাই ফকির সিরাজ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ, মন্ত্রী, শিল্পীসহ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ।
এ সময় ফকির আলমগীরের স্ত্রী সুরাইয়া আলমগীর বলেন, বিপ্লবী কণ্ঠে তিনি গণসংগীত গেয়েছেন। রেখে গেছেন গণসংগীতের প্রজ্বালিত সেই মশাল। আগামী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সেই গানগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়া হোক। তার গাওয়া কৃষক-শ্রমিকের গান, আন্দোলন-সংগ্রামের গানগুলো যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়। তাহলে এই শিল্পী সম্পর্কে জানতে পারবে আগামী প্রজন্ম। ফকির আলমগীর ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি বলে তার দুঃখ ছিল বলেও এ সময় উল্লেখ করেন সুরাইয়া আলমগীর।
ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে শনিবারও শোক জানিয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। এর মধ্যে রয়েছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল প্রমুখ।
শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান প্রমুখ। আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল প্রমুখ।
এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় পার্টি-জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক সিদ্দিকী, অভিনয়শিল্পী শংকর সাঁওজাল প্রমুখ। সাংগঠনিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে জাসদ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, পথনাটক পরিষদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়, স্পন্দন, আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোট, যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, জাসদ, ছাত্রমৈত্রী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
গতকাল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে কণ্ঠযোদ্ধা, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় —ইত্তেফাক