লকডাউনে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার সংগ্রাম

অস্ট্রেলিয়ায় গত ২৬ জুন হইতে লকডাউন চলিতেছে। দেশটিতে করোনা রোগীর সংখ্যা যে অত্যধিক তাহা নহে। সিডনিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬৪ আর ভিক্টোরিয়ায় মাত্র ১২ জন। অন্যান্য শহরেও অত্যধিক হইবে না। তবে সতর্কতাস্বরূপ ইহাতেই দেশটি নড়িয়াচড়িয়া বসিয়াছে। সেইখানে জরুরি অবস্থা জারির চিন্তাভাবনা চলিতেছে। শুধু জরুরি অবস্থা জারি নহে, অস্ট্রেলিয়া করোনা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব হইতে অর্থনীতি ও সামাজিক খাতের সুরক্ষায় যেই সকল পদক্ষেপ লইয়াছে তাহা প্রশংসনীয় ও অনুসরণীয়। যেমন—লকডাউন ঘোষণা করিবার পাশাপাশি কর্মে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রতি সপ্তাহে দেওয়া হইতেছে ৬০০ ডলার। ব্যবসায় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে এককালীন ৭ হাজার হইতে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থসহায়তা দেওয়া হইতেছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের প্রাপ্ত বেতনের ৪০ শতাংশ প্রদান করিতেছে সরকার নিজেই। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির বিলে প্রণোদনা দেওয়া হইতেছে। যাহারা ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে অক্ষম, তাহাদের কিস্তি আদায় বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। ব্যাংকগুলি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে আর্থিক ঋণসহায়তা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করিতেছে। এতত্সত্ত্বেও সেখানে লকডাউন-বিরোধী বিক্ষোভ হইয়াছে।

এবার দেখা যাউক, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকা কী পদক্ষেপ লইয়াছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আমল হইতে বর্তমান জো বাইডেনের শাসনামল পর্যন্ত দেশটিতে একের পর এক বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রণোদনাসংক্রান্ত প্যাকেজ ঘোষণা করা হইয়াছে। জো বাইডেন যেই দিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করিলেন, সেই দিনই (জানুয়ারি ২০, ২০২১) এক নির্বাহী আদেশে শিক্ষার্থীদের ঋণ ও সুদ পরিশোধের সময়সীমা সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২১ পর্যন্ত বর্ধিত করেন। মার্চ ২১, ২০২১ তারিখে তিনি আমেরিকান রেসক্যু প্ল্যান অ্যাক্টে স্বাক্ষর করেন, যাহাতে এক দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। ইহা প্রণোদনা প্যাকেজ নম্বর ৫ হিসাবে পরিচিত। এই প্যাকেজের মাধ্যমে ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করিয়া ১৫ ডলারে উন্নীত করা হইয়াছে। যাহারা বাত্সরিক ৭৫ হাজার ডলারের নিচে আয় করেন, তাহাদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা বাড়াইয়া ১ হাজার ৪০০ ডলার করা হইয়াছে। ইহার সহিত পরিবারের প্রতি নির্ভরশীল সদস্যের জন্য দেওয়া হইতেছে আরো ১ হাজার ৪০০ ডলার। ছয় হইতে ১৭ বত্সর বয়সি শিশুর জন্য বাত্সরিক চাইল্ড ট্যাক্স ক্রেডিট ২ হাজার হইতে বাড়াইয়া করা হইয়াছে ৩ হাজার ডলার। আর ছয় বত্সরের নিচের শিশুর জন্য ৩ হাজার ৬০০ ডলার। কেজি হইতে দ্বাদশ শ্রেণির স্কুলগুলির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে ১৩০ বিলিয়ন ডলার। বেকারদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হইতেছে। বিশেষত রেস্টুরেন্ট ও খাদ্য-পানীয় প্রতিষ্ঠানের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ২৫ বিলিয়ন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। ১৫ বিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে বিমানশিল্পের শ্রমিকদের জন্য। অন্যদিকে ব্রিটেন ব্যক্তিগত কর হ্রাসের পাশাপাশি সরাসরি ব্যবসায়ে অনুদান (ডাইরেক্ট বিজনেস গ্র্যান্ট) প্রদান করিতেছে। ঋণের সময়সীমা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন লোন স্কিম চালু করিয়াছে। ভ্যাট প্রদানেও বিশেষ ছাড় দিতেছে ও সময়সীমা বৃদ্ধি করিতেছে। স্বকর্মস্থানকারীদের দিতেছে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা।

বাংলাদেশ আমেরিকা, ব্রিটেন বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশ নহে; কিন্তু এই সকল দেশ কীভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতেছে তাহা হইতে কিছুটা হইলেও শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারে। এখানে অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানিমুখী কয়েকটি খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হইতেছে। যদিও এই প্রণোদনা লইয়াও অসন্তুষ্টির কথা আমাদের অজানা নহে। অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কথাও আমাদের গুরুত্ব দিয়া ভাবা প্রয়োজন। চলমান এই ১৫ দিনের লকডাউনের কারণে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তাহারা কীভাবে দিবেন? সামাজিক নিরাপত্তা খাত কি আরো গুরুত্ব পাইবার দাবি রাখে না? ইহা ছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিকে শুধু ঋণ দেওয়াটা কোনো সমাধান নহে। সেই ঋণ তাহারা কীভাবে পরিশোধ করিবেন তাহাও ভাবা দরকার। যদি লকডাউনের মধ্যে শিল্পকলকারখানাগুলির প্রতি বিশেষ নজর না দেওয়া হয়, তাহলে অনতিবিলম্বে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। এই করোনাকালে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি করিয়া যেমন মানুষকে বাঁচাইতে হইবে, তেমনি মানুষের আয়-রোজগারের সুরক্ষাও নিশ্চিত করিতে হইবে।