খাদ্য অপচয় রোধ করা জরুরি

বিশ্ব জুড়ে ক্রমাগত মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা খাদ্যসংকটের বিপরীতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে শুধু শৌখিনতার দোহাই দিয়ে। অনেক রাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি বিবেচনায় আনলেও সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না ব্যক্তিপর্যায়ে অসচেতনতার কারণে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সম্মিলিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও অপুষ্টি হার আরো বেড়েছে চলমান করোনা মহামারির প্রভাবে। প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বলছে, মহামারির প্রভাবে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষ বেড়েছে গড়ে ১৮ শতাংশ। পাশাপাশি অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি ৮০ লাখ, যা সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। সমগ্র বিশ্বের যে ৪৫টি দেশের খাদ্য ক্ষেত্রে বিদেশি সহযোগিতা প্রয়োজন, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ ৩৪টি দেশ, এশিয়ার ৯টি, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দুইটি দেশ এ তালিকায় রয়েছে। তবে বিশ্ব জুড়ে এ সংকটের মধ্যেও উলটো চিত্র দেখা গেছে সর্বশেষ গ্লোবাল ক্ষুধা সূচকের (জিএইচআই) প্রতিবেদনটিতে। বিশ্ব জুড়ে প্রায় ১০০ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে শুধু ২০২০ সালেই, যা মোট খাদ্য উত্পাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ। আবার এসব খাদ্য অপচয়ের ৬১ শতাংশই হয়েছে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খাদ্যের মধ্য থেকেই। সে হিসেবে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত খাবারের মধ্যে আনুমানিক প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বিশ্বে জুড়ে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে বা নষ্ট অথবা অপচয় হচ্ছে। এ সূচকের ১০৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। সূচকে প্রদত্ত তথ্যমতে, ক্ষুধা তীব্রতার দিক দিয়ে ১০০-এর মধ্যে ২০ দশমিক ৪ স্কোর করা বাংলাদেশের বাড়িপ্রতি ৬৫ কেজি খাদ্য বছরে নষ্ট হয়। তবে বিপুল পরিমাণে খাদ্যের এ অপচয় শুধু যে খাবারের অপচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তা কিন্তু নয়। খাদ্যে অপচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বড় অঙ্কের অর্থের অপচয়, সুপেয় পানি, ভূমি, শ্রম, জ্বালানি এবং পরিবহনের অপচয়। আবার অপচয়কৃত খাবারের বেশির ভাগই শেষমেশ ভাগাড়ে ফেলা হয় বলে সেখানে এগুলো পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। ভাগাড়ে উদ্ভূত মিথেন গ্যাস ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলো ঐ অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা রাখে।

এ কারণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার না কেনা বা কেনা হয়ে গেলে সেসব খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে অনেক বেশি পরিমাণ খাবার অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। আবার রান্না করা খাবার নিয়মিতই উদ্বৃত্ত থাকলে সপ্তাহে আমাদের এমন একটি দিন ঠিক করা উচিত, যেদিন আমরা নতুন করে রান্না না করে ফ্রিজে জমে থাকা খাবারগুলো খাব।

বাসাবাড়ির বাইরে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও প্রচুর পরিমাণ খাবার আমরা আধুনিকতার নামে প্রতিনিয়ত নষ্ট করে চলেছি। রেস্তোরাঁয় পরিমিত অর্ডার করে, প্রয়োজনে প্রতিটি রেস্তোরাঁতে ‘ওয়েস্ট ফুড সেভিংস কর্ণার‘ স্থাপন করে এবং সর্বোপরি খাবার অপচয়ের বিপক্ষে স্লোগান তুলে হলেও এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা উচিত। তবে হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাসাবাড়িতে অতিরিক্ত খাবার ফেলে দিয়েই যেসব খাদ্যে অপচয় হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এফএওর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত খাবার খেয়ে খুব মোটা হয়ে গেছে। যেখানে বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৮২ কোটি মানুষ গড়ে এক দিন না খেয়ে থাকে। কেবল সামর্থ্য থাকলেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খেয়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির অসুখ না বাধিয়ে এক টুকরো ছেড়া রুটির খোঁজে মানবতার অসহায় চিত্কারগুলো প্রশমনে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত। আবার পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদন হলেও মহামারিসহ আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক নানা সংকটের জের ধরে খাদ্যনিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক বৈষম্য, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে।

এজন্য প্রাগৈতিহাসিক খাদ্য সরবরাহ পদ্ধতির নিয়মগুলো আমাদের এখন সংস্কার করা প্রয়োজন। যেমন কীভাবে খাদ্যশস্য উত্পাদন করা উচিত, পরিবহন ও খাদ্যের বাজার নিশ্চিত করা, মোড়ক কীভাবে তৈরি করতে হয়, যাতে এসব খাদ্য স্বাস্থ্যকর হয় এবং উত্পাদনসংশ্লিষ্টরা পর্যাপ্ত দাম পান ইত্যাদি।

n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়