সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিতে আবার উদ্যোগ

দীর্ঘ এক যুগ বার বার নির্েদশনা দিয়েও সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিতে পারেনি সরকার। তাই এবার নতুন করে সংশ্লিষ্ট বিধিমালাটি কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

ইতিপূর্বে ২০০৮ সালে প্রথম সরকারি কর্মচারীদের হিসাব নিতে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক থাকায় সে সময় কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয় এই যে, প্রতিবছরেই আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়ই তাদের সম্পদের হিসাব দিতে হয়। তাহলে নতুন করে বারবার হিসাব কেন দিতে হবে? শেষমেশ আটকে গিয়েছিল সরকারের এই উদ্যোগ। ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী পাঁচ বছর পর পর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল এবং স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সরকারি কোনো কোনো কর্মচারী এই নিয়ম প্রতিপালন করছেন না বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচ বছর পর পর সম্পদের বিবরণী দাখিলের নিয়ম আছে। কিন্তু এটি সেভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এ সংক্রান্ত বিধানটি যেন মানা হয় সে বিষয়ে তাগিদ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা প্রথমে তাগিদ দিয়ে চিঠি দিলাম। কিছু দিনের মধ্যে সময় বেঁধে দেওয়া হবে। আমরা সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত কাজের অংশ করে নিতে চাই। কেউ চাকরি জীবনে এলে, অন্যান্য কাজের মতো সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টি তার রুটিন দায়িত্বের মধ্যে থাকবে। এটা হলে কর্মকর্তারা তার সম্পদের বিষয়ে আপডেটেড থাকবেন।’

এটি নিশ্চিত হলে দুর্নীতি কমবে, সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রেক্ষাপটে বিধিমালাটি কার্যকরের মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী দাখিল ও স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির নিয়ম মানতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব/সচিবদের কাছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি চিঠি পাঠানো হয়েছে। যদিও এর আগে ২০১৯ সালে নতুন মন্ত্রী আসার পর ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর/সংস্থার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছিল।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৪ শাখার উপসচিব নাফিসা আরেফীন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১১, ১২ ও ১৩-তে সরকারি কর্মচারীদের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন, বিক্রয় ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত বিধিসমূহ কার্যকরভাবে কর্মকর্তাদের অনুসরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে জোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

এমতাবস্থায় ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর আওতাভুক্তদের তাদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়/দপ্তর/অধীনস্থ সংস্থায় কর্মরত সব সরকারি কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী দাখিল, ঐ সম্পদ বিবরণীর ডাটাবেজ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে স্থাবর সম্পত্তি অর্জন ও বিক্রয়ের অনুমতি গ্রহণের বিষয়ে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ১১, ১২ এবং ১৩ বিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয় ঐ চিঠিতে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীর জমি/বাড়ি/ফ্ল্যাট/সম্পত্তি ক্রয় বা অর্জন ও বিক্রির অনুমতির জন্য আবেদনপত্রের নমুনা ফরম এবং বিদ্যমান সম্পদ বিবরণী দাখিলের ছকও চিঠির সঙ্গে পাঠানো হয়েছে।

সম্পদের হিসাব দিয়েছিল শুধু ভূমির কর্মচারীরা

২০১৯ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব ভূমিসেবা দিতে অন্যতম কৌশল হিসেবে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার ঘোষণা দেন। ঐ বছরের ১৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ জারি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিতে পারেনি ভূমি মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সংস্থার ১৭ হাজার ৫৭৬ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে ১৭ হাজার ২০৮ জনের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করে। বিভাগীয় মামলায় সাময়িক বরখাস্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকার কারণে ৩৬৮ জন কর্মচারী সম্পদের বিবরণী দাখিল করতে পারেননি। সম্পদ বিবরণী দাখিলের ফলে অনিয়ম-দুর্নীতি করতে সবাই নিরুত্সাহিত হবেন। এখন থেকে সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের কর্মসূচি চলমান থাকবে বলে ঐ সময় জানিয়েছিলেন ভূমিমন্ত্রী।