ন্যাটো-চীন দ্বন্দ্বের আভাস

নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো (NATO) নামক বহুজাতিক পশ্চিমা সামরিক জোটটির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। সংগত কারণেই ন্যাটো-চীন সম্পর্কের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্কণ্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য সময় ধরে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন দাপটের সম্মুখে নেতৃত্বপ্রত্যাশী রাশিয়া ও চীন ছিল অনেকটাই অসহায়। কিন্তু গত দশক থেকেই পালটে যেতে থাকে এই প্রেক্ষাপট। এই বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে কে? নাকি ইউরোপীয় দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকা সামরিক জোট ন্যাটোর মাধ্যমে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে বহাল তবিয়তে থাকবে? সাম্প্রতিক ন্যাটো-চীন বাগ্যুদ্ধের বিস্তার এরকম বহুমুখী আলোচনার সূত্রপাত করেছে।   

ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও কঠিন সময় অতিক্রম করছে নতুন পরাশক্তি চীন। করোনা ভাইরাসের উত্পত্তিসংক্রান্ত বিতর্কে ভাবমূর্তি-সংকটে পড়েছে বিশ্বনেতৃত্বপ্রত্যাশী চীন। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব উত্তর আশির দশক থেকে দেশটির অর্থনৈতিক উত্থানের শুরু। সেই সময় থেকেই বেইজিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সংহত করার প্রয়াস নেয়। এই ধারাবাহিকতায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গত দশক থেকেই চীনের সামগ্রিক সাফল্য প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। এই সূত্র ধরে এমন ধারণা স্পষ্ট হয়ে যে, বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়ার অভিপ্রায়ে সমাজতান্ত্রিক চীন নিজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এর আগে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একক শক্তি হিসেবে নিজের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশটি আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেখায়। কিন্তু ব্যতিক্রম থাকে আমেরিকা। ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন-বেইজিং মতাদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতার প্রকোপ পড়ে বিশ্বব্যবস্থায়। এই পরিস্থিতির পূর্ভাবাস পাওয়া যায় অবশ্য স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের অব্যবহিত পরেই। অন্যদিকে গত দশকের শুরুতেই এই সমীকরণ সত্যে রূপান্তরিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন-মার্কিন স্বার্থগত দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। এই যখন অবস্থা, ঠিক তখনই চীনের জন্য অশনিসংকেত হয়ে আসে করোনা ভাইরাস। উল্লেখ্য, ভাইরাসটির উত্পত্তি ও বিস্তারের জন্য পশ্চিমারা একযোগে চীনকে দায়ী করে আসছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ পূর্তি উদ্যাপনের প্রাক্কালে নিজের অগ্রযাত্রায় করোনার এই হোঁচটে কিছুটা বিব্রত বেইজিং। যদিও এর নেতিবাচক প্রভাব সামলাতে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব নানামুখী কৌশল ও কূটনৈতিক তত্পরতা অব্যাহত রেখেছেন। এ-সংক্রান্ত পশ্চিমা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পালটা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে চীন প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নিয়েছেন। এতত্সত্ত্বেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক সর্বাত্মক ঝুঁকিতে আছে। উপরিউক্ত দুই অঞ্চলের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষণ আপাতত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আটলান্টিক দেশগুলোর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবেই বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। এ ধরনের আশঙ্কার প্রতিধ্বনি শোনা গেল লন্ডন ও ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় জি-৭ ও ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে। গত মাসে অনুষ্ঠেয় ঐ দুই শীর্ষ সম্মেলনে পুঁজিবাদী বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি জাপানের সরব উপস্থিতিতে এবারের জি-৭ ও ন্যাটো সম্মেলন চীনের বিরুদ্ধে বিষোদগারের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। উপরিউক্ত দুই সম্মেলনেই উপস্থিত পশ্চিমা নেতারা চীনের উচ্চাভিলাষী সামরিক পরিকল্পনার জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ন্যাটো জোটের প্রধান বেইজিংয়ের সামগ্রিক সামরিক তত্পরতাকে ট্রান্স আটলান্টিকসের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বলে অভিহিত করেন। চীনের সামরিক বাজেট, বর্ধনশীল পরমাণু কর্মসূচি ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প নিয়ে জোটের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। এই পরিস্থিতিতে জোটের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন ন্যাটো মহাসচিব। এই প্রেক্ষাপটে চীনকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে নানামুখী পরিকল্পনার উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন ন্যাটো-প্রধান। ন্যাটো জোটের কার্যক্রমকে বিভিন্ন আঙ্গিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এই সম্মেলনে অগ্রাধিকার পেয়েছে ‘ন্যাটো প্লাস ফোর’ পরিকল্পনা। ন্যাটো প্লাস ফোর পরিকল্পনা হচ্ছে জোটের চার এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশীদার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজল্যান্ডকে ন্যাটোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে বেশি মাত্রায় অংশগ্রহণ করানো। এ ধরনের আগ্রহের উদ্দেশ্য নিয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। এটা খুব স্পষ্ট যে, চীনকে লক্ষ্য করেই উপরিউক্ত দেশগুলোকে ন্যাটোর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জোর তত্পরতা চালাচ্ছেন পশ্চিমারা। এমনটি হলে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনের সঙ্গে বহুমাত্রিক লড়াইয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বহর লম্বা হবে তাদের। একই সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের ঘটনাবলিতে ন্যাটোর অংশগ্রহণের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে উঠবে। বিশেষ করে, দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি ও কোরীয় উপদ্বীপকেন্দ্রিক সম্ভাব্য সংঘাতে ন্যাটোকে জড়িয়ে ফেলার পাঁয়তারা হচ্ছে এই প্রক্রিয়াটি। এর মধ্য দিয়ে ন্যাটোর শান্তির জন্য অংশীদারিত্ব প্রকল্প পূর্ব ইউরোপ, সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রসমূহের পাশাপাশি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে বিস্তৃত হয়ে পড়বে। সংগত কারণেই বিশ্বরাজনীতির গতিপথে ন্যাটো-চীন দ্বন্দ্ব একটি নতুন উপাদান হিসেবে বৈশ্বিক সমীকরণে গুণগত পরিবর্তনের স্পষ্ট পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ করব যে, স্নায়ুযুদ্ধের প্রকোপে রুশ-মার্কিন স্বার্থগত দ্বন্দ্বের বাইরে নিভৃতে জাতীয় শক্তি, সামর্থ্য ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগী ছিল চীন। এর পরের ইতিহাস ভিন্ন। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান, সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাঙনের মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতির গতিপথে আসে বিস্তর পরিবর্তন। ঐ ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোভিয়েত অনুপস্থিতির ক্ষেত্রগুলোতে চীনের উপস্থিতির ফলাফল হিসেবে দ্রুতই দেশটির অর্থনৈতিক চেহারা আমূল পালটে দেয়। অর্থনৈতিক সাফল্যকে পুঁজি করে চীন নিজের সামরিক সক্ষমতা যুগোপযোগী করতে বৃহত্ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ইতিহাসের এই অধ্যায়কে পূর্ণতা দেয় চীন। এ সময় বিশ্বব্যাপী চীনের ক্ষমতাপ্রবাহের গতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দেশটির এই উত্থান পরাশক্তি আমেরিকা ও ন্যাটো জোটের জন্য সত্যিকার চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ন্যাটো সম্মেলনে পশ্চিমাদের উদ্বেক আশ্বর্য কিছু নয়। যদিও চীন ব্রাসেলস ও লন্ডনে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো ও জি-৭ সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে বেইজিং-সম্পর্কিত উদ্বেক উত্কণ্ঠাকে অতিরঞ্জিত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের দাবি তাদের সামরিক সক্ষমতা নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরিচালিত হচ্ছে। এ নিয়ে ন্যাটোর ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু চীনের দাবির সঙ্গে বাস্তবতার রয়েছে বিস্তর ফারাক। কেননা এশিয়া অঞ্চলে চীনের প্রভাব রুখতে আমেরিকা তথা পশ্চিমাদের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে তাইওয়ান ইস্যু। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তাইওয়ানের ব্যপারে চীনের নীতি ক্রমশ কঠোর হয়ে উঠছে। বিতর্কিত ঐ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে চীন অনেকটাই বেপরোয়া। ফলে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাতের শঙ্কাও দিনদিন প্রবল হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ন্যাটো-চীন দ্বন্দ্বের বিস্তার শিগিগর এশিয়া প্যাসিফিকের সামগ্রিক সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কেননা ‘ফোর প্লাস’ পরিকল্পনার মাধ্যমে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দুটি শক্তিকে ন্যাটো কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে এই অঞ্চলে জোটের শক্তি বহু গুণে বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে ন্যাটো কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে। এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতোই এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক কর্তৃত্বে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে ন্যাটো। এই ধরনের ঘটনা চীনের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। ন্যাটো চীন দ্বন্দ্বের এই বাস্তবতা স্পষ্টত দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান-কেন্দ্রিক বেইজিং-ওয়াশিংটন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারণ। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে ন্যাটোর অপেক্ষাকৃত কম উপস্থিতির কারণে চীনের সামরিক সুবিধাজনক অবস্থান গুরুতর চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে। এই সমীকরণ ন্যাটো-চীন সম্পর্কে সৃষ্ট উত্তেজনার পরিধিকে ক্রমশ বিস্তৃত করবে।

n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা