মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে নানা ঘটনার ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এসব ঘটনার পালাবদলের ফলে বৈপ্লবিক নানা পরিবর্তনের ধারায় বদলে গেছে পূর্বতন চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও মতবাদের; সেই সঙ্গে বদলে গেছে বিশ্বের শিল্প উত্পাদন, বাজারকাঠামো, মানুষের জীবনাচার ও ইতিহাসের নানা গতিপথ। সমাজ-সভ্যতার মোড় পরিবর্তনকারী শিল্পবিপ্লবগুলো সভ্যতাকে যেমন এনে দিয়েছে নতুন নতুন সম্ভাবনা, একই সঙ্গে মুখোমুখি করেছে নতুন সব চ্যালেঞ্জেরও। মনুষ্যজাতি এখন পর্যন্ত পূর্বতন তিনটি শিল্পবিপ্লব অতিক্রম করে প্রবেশ করেছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে।
১৭৮৪ সালে জেমস ওয়াট কর্তৃক বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সূচনা ঘটে, যার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে পদার্পণ করে ইংল্যান্ড। পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনার একটি প্রথম শিল্পবিপ্লব, যার মাধ্যমে ‘পৃথিবীর কারখানা’ বলে সমাদৃত ইংল্যান্ডের বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বার উন্মোচন হয়। অধিকন্তু, বর্তমান সময়ের ‘গ্লোবাল বিলেজ’ ধারণার উদ্ভবও শিল্পবিপ্লবের সুদূরপ্রসারী ফলেরই প্রতিচ্ছবি। পরবর্তী সময়ে ১৮৭০ সালে বিদ্যুতের আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়; যার মাধ্যমে শিল্পের পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। সেখান থেকে শতবর্ষ পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর কর্তৃক ১৯৬৯ সালের ইন্টারনেটের আবিষ্কার তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল বহুগুণে। ফলে, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির বিকাশ ঘটার মাধ্যমে ভারী ও মাঝারি শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়। সময়ের পরিক্রমায় বৈপ্লবিক এসব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন নামের নতুন এক বিপ্লবের, যেটি সব দিক থেকেই আগের তিনটি বিপ্লবকে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্লাউস শোয়াব তার বিখ্যাত ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’ নামক বইটিতে সর্বপ্রথম ডিজিটাল বিপ্লব বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিস্মৃত ধারণা প্রদান করেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মূলত তৃতীয় শিল্পবিপ্লবেরই বর্ধিত রূপান্তর; যার মাধ্যমে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্ভব ঘটবে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে জীবনযাপন করি, যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত পরিচালনা করি, সেগুলোর সব ক্ষেত্রে এক ডিজিটাল রূপান্তর ঘটাবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। আর এসব সম্পন্ন হবে একটি ইন্টারনেটকেন্দ্রিক স্মার্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কে বহুজাতিক মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ডিজিসেলের চেয়ারম্যান ডেনিস ও ব্রায়েন বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে ডিজিটালাইজেশন আমাদের কাজের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তবে এই পরিবর্তনকে তিনি দেখছেন সূচনা হিসেবে। আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল রূপান্তরের ফলস্বরূপ আমরা এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যা এর আগের ৫০ বছরেও সম্ভব হয়নি। তার ভবিষদ্বাণীর প্রভাব মহামারির এই সময়ে ডিজিটাল রূপান্তরের চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এই সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন অনেক কার্যক্রমই সংঘটিত হচ্ছে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক ভার্চুয়াল সংযোগের মাধ্যমে, যা আগামী দিনে আরো ব্যাপক পরিসরে ডিজিটাল রূপান্তরেরই বার্তা প্রদান করে।
বর্তমান পৃথিবীতে বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র লক্ষণীয়। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে প্রযুক্তিগত উত্কৃষ্টতায় নিজেদের সক্ষমতার জানান দিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মহাকাশে পাঠিয়েছে স্যাটেলাইট, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হচ্ছে কম্পিউটার প্রযুক্তি সুবিধাসংবলিত হাইটেক পার্ক; জোর দেওয়া হচ্ছে কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রেও। তবে এসব সম্ভাবনার মধ্যে মুদ্রার উলটো দিকটাও প্রতীয়মান। আগামী দিনে শিল্প উত্পাদনসহ সব ক্ষেত্রে ব্যবহূত হবে কম্পিউটার নিয়নন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কলকারখানা, বাসাবাড়ি, স্কুল-কলেজসহ প্রাত্যহিক জীবনের সব ক্ষেত্রে ব্যবহূত হবে কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত রোবটিকস প্রযুক্তি। আর এসব প্রযুক্তি পরিচালনা করবে মানুষ। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লবের দরুন বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের কাজ হারাবেন; অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষের আয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলস্বরূপ, সমাজব্যবস্থায় আয়বৈষম্য আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ৬০ শতাংশ, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পে ৪০ শতাংশ, চামড়া ও জুতাশিল্পে ৩৫ শতাংশ এবং সেবাশিল্পে ২০ শতাংশ লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দক্ষ ও প্রযুক্তিশিল্পে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ প্রভূত উন্নতি সাধন করবে। কিন্তু বাংলাদেশে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের হার মাত্র ১৪ শতাংশ, অন্যদিকে উন্নত বিশ্ব এই হার ৬০ শতাংশ। সেহেতু আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বৃত্তের বাইরে এসে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর এজন্য রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে উক্ত চ্যালেঞ্জের উত্তরণ ঘটাতে হবে। সর্বোপরি, ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ যুগোপযোগী ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ডিজিটাল বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যোগ্যতাসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়