আজকে আমরা রঙিন মলাটে বাঁধানো যে বই পড়ছি, তা হাজার হাজার বছরের সাধনার ফল। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ প্রথম পাথর, প্রস্তরখণ্ড, শিলালিপি, কাদামাটির পোড়ানো ফলক, গুহার দেয়াল, পশুর চামড়া ইত্যাদিতে লিখত। যতদূর জানা যায়, পাথরে লেখার প্রথম প্রচলন শুরু হয় সম্রাট অশোকের জন্মের প্রায় চার হাজার বছর আগে আসিরিয়া ও ব্যাবিলনে। মাটি খুঁড়ে ব্যাবিলনের একটি লাইব্রেরিতে বাইশ হাজারের বেশি পাথরে লেখা বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। পাথরে লেখা বেশ ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য ছিল বলে সবাই লেখার জন্য বিকল্প পদ্ধতির অনুসন্ধান শুরু করে। ঠিক তখন মিশরে নতুন এক পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। মিশরে নলখাগড়ার মতো দেখতে প্যাপিরাস নামে এক ধরনের গাছ জন্মাত। মিশরীয়রা এই প্যাপিরাসের পাতায় লিখতে শুরু করে। তারা প্যাপিরাসের পাতায় লিখে লম্বা কাপড়ের থানের মতো গুটিয়ে রাখত। সবচেয়ে বড় প্যাপিরাস পাতার বইয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ১২০ ফুটের মতো। প্যাপিরাসের পাতায় লেখা বই একসময় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বলে রাখা ভালো, এই প্যাপিরাস শব্দ থেকেই ইংরেজি পেপার শব্দের উত্পত্তি।
অন্যদিকে চীন দেশের লোকেরা লেখার জন্য বাঁশের ফলক এবং কাপড় ব্যবহার করত। একসময় তারা কাপড়ের টুকরো, বাঁশ, গাছের ছাল একসঙ্গে মিশিয়ে গুঁড়ো করে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কাগজ তৈরি করে। চীনারা কাগজ তৈরির এই কৌশল অনেক দিন নিজেদের মাঝে গোপন রাখলেও তা আরবে এবং পরে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ পনেরো শতকে জার্মানির জোহানেস গুটেনবার্গের আবিষ্কার করা মুদ্রণযন্ত্র বইয়ের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। ১৪৫৫ সালে গুটেনবার্গ বাইবেল গ্রন্থটিকে তাঁর প্রেসে প্রথম ছাপেন। যা বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম ছাপা বইয়ের সম্মান পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই বই ছাপানোর এই প্রযুক্তি ইউরোপ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে সব দেশেই বই মুদ্রিত হতে শুরু করে। গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে বইয়ের দাম ছিল জনসাধারণের নাগালের বাইরে। সেসময় জার্মানি চার্চে রাখা বইগুলোকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো, যেন কেউ চুরি করতে না পারে। কারণ একেকটি বইয়ের দাম ছিল জার্মানি শহরের একেকটা বাড়ির দামের চেয়েও বেশি!
নূরে আলম সিদ্দিকী শান্ত