ফকির আলমগীর ছিলেন দেশের একজন কণ্ঠযোদ্ধা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন। অবশ্য এর আগে ষাটের দশক থেকেই গণসংগীত করে আসছিলেন তিনি। মানুষ ও মানবতার কথা তিনি দরাজ কণ্ঠে ছড়িয়ে দিয়েছেন চারদিকে। করোনা আক্রান্ত হয়ে কিংবদন্তি এই গণসংগীতশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গত ২৩ জুলাই রাতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। গুণী এই সংগীতশিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখেছেন ফয়জুল আল আমীন
ফকির আলমগীরের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে। কালামৃধা হাইস্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন ফকির আলমগীর। সেই সূত্রেই গণসংগীতে আসা। ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে তিনি ষাটের দশক থেকেই সরব হয়ে ওঠেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগে যেসব বড় আন্দোলন হয়েছিল, সেগুলোতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন ফকির। তার কণ্ঠ বজ্র হয়ে বেজেছিল আন্দোলনের মিছিলে। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধে ফকির আলমগীর যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। কণ্ঠসৈনিক হিসেবে তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের মনে ছড়িয়ে দেন বিজয়ের স্পৃহা, সাহসের আলো।
দেশ স্বাধীনের পর পূর্ণাঙ্গভাবে সংগীতে মনোনিবেশ করেন ফকির আলমগীর। নিজেই গড়ে তোলেন ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী। কেবল গণসংগীত নয়, ফকির আলমগীর স্বাধীন দেশে পপ গানের সঙ্গে লোকজ সুরের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিয়মিত গান করতে থাকেন। ফকির আলমগীরের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটির শিরোনাম ‘ও সখিনা’। গানটির প্রথম লাইন এরকম— ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্যা আমারে, আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে’। এই গান শোনেনি, এমন শ্রোতা দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ‘সান্তাহার জংশনে দেখা’ গানটির কথা কেউ কি ভুলতে পারবেন? সান্তাহার না হোক, যে কোনো রেল জংশনে গেলেই হয়ত মনের গহীনে বেজে উঠবে ফকির আলমগীরের এই গান। এছাড়াও ফকির আলমগীরের কণ্ঠনিঃসৃত ‘আহারে কাল্লু মাতব্বর’, ‘ও জুলেখা’, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’ গানগুলো শ্রোতারা মনে রাখবেন অনেক দিন। কেবল নিজের গান নয়, ফকির আলমগীর গেয়েছেন প্রচলিত ফোক ও আধ্যাত্মিক গানও। তার কণ্ঠে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘বনমালী তুমি’ ও ‘মন আমার দেহঘড়ি’ গানগুলো। আরও একটি গানের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। সেটার নাম ‘মায়ের একধার দুধের দাম’। এই গানটি ফকির আলমগীরের কণ্ঠে একেবারে শহর-গঞ্জ-গ্রামে সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এখনো গানটি মানুষের হূদয়ের স্পন্দনে জায়গা করে আছে। বার্ধক্যে এসেও ফুরিয়ে যাননি ফকির আলমগীর। নিয়মিতই গান করে গেছেন। বছর খানেক আগেই তিনি গান করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিহত হওয়া জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে। যা তার সংগীত ভাবনার বিস্তৃতিকে আরও একবার প্রমাণ করেছিল। দেশীয় সংগীতে ফকির আলমগীরের অবদান কতখানি, তা পরিমাপ করা অসম্ভব। তবে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিল সরকার। ১৯৯৯ সালে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মানজনক একুশে পদক। অবশ্য পুরস্কারের চেয়েও ফকির আলমগীরের বড় প্রাপ্তি ছিল গণমানুষের ভালোবাসা। সংগীতের মাধ্যমে তিনি মানুষকে যতটা আনন্দ দিয়ে গেছেন, যতটা সাহস আর প্রতিবাদ শিখিয়ে গেছেন, তা টিকে থাকবে যুগের পর যুগ। আর গণসংগীতের নায়ক হয়ে ফকির আলমগীর থেকে যাবেন দেশের ইতিহাসের স্বর্ণালী পাতায়। হে অনন্তের অভিযাত্রী, অভিনন্দন আপনাকে, ভালো থাকুন সুদূরে।