২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর। এই দিন পুলিশি দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামের এক ফলবিক্রেতা গায়ে আগুন দিয়া আত্মাহুতি দেন। ইহার মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় বিদ্রোহ ও গণবিপ্লব শুরু হয়। গণবিক্ষোভের এই অনল ক্রমান্বয়ে ছড়াইয়া পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। পশ্চিমা সাংবাদিকরা ইহারই নাম দেন ‘আরব বসন্ত’। আরব বসন্তের প্রবল ধাক্কায় এক-এক করিয়া স্বৈরাচারের তখত তাউস ধসিয়া পড়ে। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক জেন এল আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে। তিনি সৌদি আরবে পলায়ন করিয়া কোনোরকমে জীবন রক্ষা করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি মিশরের ৩০ বত্সরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ নূতন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ ঘোষণা করেন, ২০১৩ সালের পর তিনি আর রাষ্ট্রপতি থাকিবেন না। ২০ অক্টোবর লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন লিবিয়ার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি। অবসান ঘটে তাহার ৪২ বত্সরের শাসনামল। ইহা ছাড়া আরব বসন্তের মাত্র পৌনে দুই বত্সরে লিবিয়া, সিরিয়া, বাহরাইন, আলজেরিয়া, ইরান, মরক্কোতে বড় ধরনের বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়। ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান প্রভৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশে গণবিক্ষোভ ছড়াইয়া পড়ে। এখন নূতন মোড়কে আরব বসন্তের কি নূতন পদধ্বনি শুনা যাইতেছে?
আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় আবার শুরু হইয়াছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। দেশটিতে এখন কার্ফিউ জারি করা হইয়াছে। কিছুদিন আগে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিশাম মোশিশিকে বরখাস্ত করিয়া পার্লামেন্ট স্থগিত ঘোষণা করিয়াছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ। প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা করোনা ভাইরাস ও অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করিতে ব্যর্থতার অভিযোগে সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার ও বৃহত্তম মধ্যপন্থি ইসলামি দল আল-নাহদার প্রধান রশিদ ঘানুশি প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপকে ‘বিপ্লব ও সংবিধানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তাহার সমর্থকরা পালটা বিক্ষোভ করিয়াছে। তবে প্রেসিডেন্ট সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন, কেহ গুলি চালাইলে সশস্ত্র বাহিনী তাহা বুলেটের মাধ্যমে জবাব দিবে। ২০১১ সালের গণ-অভুত্থানের কেন্দ্রস্থল রাজধানী তিউনিসের হাবিব বুরগিবা অ্যাভিনিউ দখল করিয়া রাখিয়াছে প্রেসিডেন্ট-সমর্থকরা। কার্যত এক দশক পর ইহা একটি পালটা অভ্যুত্থান। ঘানুশি গত সোমবার পার্লামেন্টে প্রবেশ করিতে গেলে তাহাকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাধা প্রদান করেন। এই সময় তিনি বলিয়াছেন, তিউনিসিয়ার জনগণ আবার একনায়কতন্ত্রের যুগে ফিরিয়া যাইবে না।
তিউনিসিয়ার চলমান অস্থিরতার ঢেউ কি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে এবারও ছড়াইয়া পড়িতে পারে? এই অভ্যুত্থানের পিছনে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স ও আমেরিকার সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক নহে। জো বাইডেনের ক্ষমতারোহণের পর মধ্যপ্রাচ্যে এই তিন দেশ ছাড়াও মিশর, সৌদি আরব নূতন ভূরাজনৈতিক খেলায় নিমগ্ন। তিউনিসিয়ায় আপাতত মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থি আল নাহদা পরাজিত হইয়াছে। ব্রাদারহুড শাসক মুরসির বিরুদ্ধে মিশরের সামরিক জান্তা আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির অভ্যুত্থানের সহিত ইহার সাদৃশ্য বিদ্যমান। ব্রাদারহুডপন্থিরা তুরস্কেও ক্ষমতাবান। তাই সেই জোটের পরবর্তী টার্গেট যদি তুরস্ক হয়, তাহাতে আমরা বিস্মিত হইব না। তবে তিউনিসিয়া ও মিশর এক নহে। এখানে পুলিশ বাহিনী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলি শক্তিশালী বিধায় শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থান টিকসই হইবে কি না বলা মুশকিল। তবে রাজনৈতিক মাঠের মোড় ঘুরাইতে গণতন্ত্রকামী তিউনিসিয়াবাসীদের যে এবার রক্তের বড় পরীক্ষা দিতে হইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তিউনিসিয়া ও হাইতির মতো করোনা ভাইরাসের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করিয়া এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে যে অস্থিরতা দেখা দিবে না, তাহা আমরা হলফ করিয়া বলিতে পারি না।