এত দিন প্রবাসীরা আমাদের দিয়েছেন, এখন আমরা তাদের দেব :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এতদিন প্রবাসীরা আমাদের দিয়েছেন, এখন আমরা তাদের দেব। করোনার কারণে যারা দেশে ফিরে এসেছেন তারা যেন সম্মানজনক কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারেন। অথবা আরো উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে ফিরে যেতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি এই অনুশাসন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে শেরেবাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের জানান, সভায় ৪২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়ক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পটি চলতি বছর শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে ৩২টি জেলায় বাস্তবায়ন করা হবে। এতে বিশ্বব্যাংক ৪২৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে।

সভায় জানানো হয়েছে, করোনার এই সময়ে প্রায় ৫ লাখ প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। প্রকল্পটির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর কারণে বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ২ লাখ কর্মীর ওরিয়েনটেশন ও কাউন্সেলিং প্রদান করা হবে। নগদ অর্থ সহায়তা বাবদ কর্মী প্রতি ১৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হবে। বিভিন্ন কাজে দক্ষ ২৩ হাজার ৫০০ কর্মী বাছাই করে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সনদের ব্যবস্থা করা হবে। সেইসঙ্গে তাদের দেশে-বিদেশে চাকুরি প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করা হবে। প্রকল্পটির আওতায় প্রত্যাগত কর্মীদের তথ্যসমৃদ্ধ ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আর্থিক, কারিগরি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পেতে সহযোগিতা প্রদান করা হবে। দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন উত্পাদনশীল কার্যক্রম ও ছোট ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থাও করা হবে।

একনেক সভায় মোট ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে তিনটি সংশোধিত। নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ ও সংশোধিত প্রকল্পের বাড়তি বরাদ্দ মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৭৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ২ হাজার ১৫০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ধরা হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা। 

সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এম মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, সভায় নারীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের একটি প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা প্রকল্প না নিয়ে রাজস্ব খাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে। সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ওভারপাস, আন্ডারপাস ও ইউলুপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রাস্তার কারণে যাতে যান ও মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সড়ক ও জনপ্রশাসন বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ব্রিজ বানাতে উচ্চতা ঠিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমাদের দেশ জোয়ার-ভাটার দেশ। তাই ব্রিজের উচ্চতা সঠিকভাবে রাখতে হবে। যাতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত না হয়। এজন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এছাড়া  যেখানে সেখানে বালু মহাল না করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে দুধ প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

উল্লেখ্য, সভায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ/পুনর্বাসন শীর্ষক প্রকল্পটির ১ম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। এখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সময় আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, প্রকল্পের আওতায় বরিশাল বিভাগে জরাজীর্ণ ৮০৫টি লোহার ব্রিজ ভেঙে সেখানে আরসিসি বা পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। সবমিলিয়ে ১ হাজার ২৪৪টি লোহার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসন করা হবে।

বসিলা ব্রিজ ভেঙে উচ্চতা বাড়ানো হবে :

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, নির্বিঘ্নে নৌচলাচলের স্বার্থে বসিলা ব্রিজ প্রয়োজনীয় উচ্চতায় পুনর্নির্মাণ করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেমন মোহাম্মদপুর বসিলা সেতুটিও কম উচ্চতায় নির্মাণ হয়েছে। এটা আমাদের কোনো কাজে আসেনি। ব্রিজটির কারণে তুরাগ নদীতে পণ্যবাহী কার্গোগুলো চলাচল করতে পারে না। ব্রিজটি ভেঙে উচ্চতা বাড়াতে হবে। উল্লেখ্য, বুড়িগঙ্গা নদীতে নির্মিত শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু (বছিলা সেতু নামে পরিচিত) ২০০৯ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল। মাত্র ১১ বছরের ব্যবধানে সেতুটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

একনেক সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো, ৫৬৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কে ৩টি আন্ডারপাস এবং পদুয়ার বাজার ইন্টারসেকশনে ইউলুপ নির্মাণ, ১৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় বাংলাদেশ চ্যান্সারি ভবন নির্মাণ, ১৭৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইনস্টিটিউট অব টিস্যু ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োমেটেরিয়াল রিসার্চ-এর সেবা ও গবেষণা সুবিধাদির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, ৭২ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল  বিশ্ববিদ্যালয়ে  পূর্ণাঙ্গ শিশু কার্ডিওলজি ও শিশু কার্ডিয়াক সার্জাির ইউনিট স্থাপন, ৪৪৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলাধীন বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ, ৯৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে বিসিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী, ঠাকুরগাঁও প্রকল্প। সভায় জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (ময়মনসিংহ জোন) শীর্ষক প্রকল্পের ১ম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যয় বেড়েছে ১১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মূল ব্যয় ছিল ৫৬৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আরো এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে। সভায় জেলাভিত্তিক মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ (৬৪ জেলা) প্রকল্পটির ৩য় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৩ মেয়াদ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।