যে গানে উদ্দীপ্ত হতাম

ফকির আলমগীর। বাংলাদেশের এক কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী। তাঁর গানের সঙ্গে পরিচিত হই স্কুলজীবনে। তাঁর ‘ও সখিনা, গেছস কিনা ভুইল্লা আমারে / আমি অহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে’—গানটা আমাদের মুখে মুখে ফিরত। খেলার মাঠে, পুকুরে সাঁতার দিতে, স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা ফসলের মাঠে যেখানেই একটু নির্জনতা পেতাম আমরা দল ধরে গানটা গাইতাম। সে সময় এই গানের অর্থ বুঝতাম না। তবে গানের সুর আর গায়কী আমাদের আকর্ষণ করেছিল। আমরা দীর্ঘকাল এই গানটা গলা ছেড়ে গেয়েছি। সেই তরুণ বয়সেই আমরা ফকির আলমগীরের গানের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নানা আন্দোলন-সংগ্রামে ফকির আলমগীরের গান ছিল আমাদের প্রেরণা। ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর স্বার্থ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করার বিষয়ের অভাব ছিল না। তাই কিছুদিন বাদে বাদেই আমরা রাস্তায় নেমে পড়তাম। সঙ্গে ছিল ফকির আলমগীরের গান। এছাড়া রাকসু থেকে থিয়েটারের ছুটি হলে ভরসন্ধ্যায় আমরা গান গেয়ে ফিরতাম। নানা আকার-প্রকারের গান। এর মধ্যে একটা বিশেষ অংশ জুড়ে থাকত ফকির আলমগীরের গান। তাঁর গান ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বাঁধভাঙা জোয়ারের প্লাবন। কেউ নিষেধ করার নেই। কেউ শুধরে দেওয়ার নেই। আমরা যা গাইব তা-ই সই। তাই গান গাইতে আমাদের বাঁধত না। গলা ছেড়ে নবাবি চালে ফকির ভাইয়ের গান গেয়ে গেয়ে আমাদের থিয়েটারের নারীকর্মীদের হলে পৌঁছে দিতাম।

প্রতিটি বিকেল কাটত গান আর নাটক নিয়ে। অধিকাংশ সময় রাকসুর সামনে, শহীদ মিনারে, শহীদুল্লা কলাভবনের সামনের আমতলায় কিংবা পানির ট্যাংকির সামনে আমাদের গানের আড্ডা বসতো। থিয়েটারের মহড়া শুরু হওয়ার আগে কিংবা মধ্যে মধ্যেই আমরা শৌখিন গানের দল গলা ছেড়ে গাইতাম। সে সব আড্ডায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ডিএল রায়, রজনীকান্তের গানও থাকত। তবে সবচেয়ে বেশি গাওয়া হতো দেশাত্ববোধক গান। আর আমাদের কয়েক আনকোরা বন্ধুর গলায় ছিল ফকির আলমগীরের গান। গিটার আর ঢোল নিয়ে চলত গানের আসর। বিশেষ করে অডিটোরিয়ামে যদি কোনো অনুষ্ঠান থাকত তবে আমাদের গানের আসরও চলত দীর্ঘ সময় ধরে। এর কারণ অডিটোরিয়ামের অনুষ্ঠান শেষে মেয়েদের হলে পৌঁছে দেওয়ার বাস পাওয়া যেত। এই বাড়তি সুবিধার জন্য আমাদের গানের আসর দীর্ঘস্থায়ী হতো। তবে আসরের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন ফকির আলমগীর। মুখ থেকে মুখে তাঁর গানের পরম্পরা উচ্চারিত হতো। আমাদের কিছু বন্ধু ছিল যারা বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাদের মুখে ফকির আলমগীরের গান ছাড়া আর কোনো গান তেমন একটা শোনা যেত না।

রাজশাহী থেকে লেখপড়া শেষে ঢাকায় যাই। ঢাকায় গিয়ে সরাসরি ফকির আলমগীরের গান শোনার সুযোগ হয়। অনেকবারই খুব কাছে থেকে গান শুনেছি। কখনো কথা বলার চেষ্টা করিনি। দূর থেকেই তাঁকে ভালোবেসেছি। টেলিভিশনে তাঁর গানের অনুষ্ঠান থাকলে দেখার চেষ্টা করতাম। তিনি আমাদের অনুপ্রেরক শক্তি ছিলেন। তাঁর গান শুনে আমরা উদ্দীপ্ত হতাম। সমাজ-সংসারের প্রতি একপ্রকার দায়িত্ববোধ অনুভব করতাম।

আজ ফকির আলমগীর না ফেরার দেশে চলে গেছেন। সংবাদটা প্রথম পাই তপন দার মাধ্যমে। তপন বাগচী প্রথমে সংবাদটা জানিয়ে পোস্ট করেন। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। করোনাকাল, বাইরে তেমন একটা বের হওয়া হয় না। বের হওয়ার সুযোগও কম। ঘরে বসেই কিছুটা সময় মনের সঙ্গে যুদ্ধ করি। ফকির আলমগীর নেই। তাঁকে আর কখনো মঞ্চে গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করতে দেখা যাবে না। কিন্তু তিনি আছেন, থাকবেন আমাদের মনের মধ্যে, প্রজন্ম পরম্পরায়।