বিনিয়োগ ডাকিয়া আনা যায় না

আধুনিককালের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য বিষয় হইল প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ, যাহাকে সংক্ষেপে ডিএফআই বলা হইয়া থাকে। কোনো একটি দেশ হইতে অন্য কোনো একটি দেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনাই হইল ডিএফআই। এই প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ সাধারণত মূলধনভিত্তিক এবং দীর্ঘস্থায়ী হইয়া থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্ব সাধারণত প্রত্যাশা করে ধনাঢ্য দেশ হইতে যাহাতে এই বিনিয়োগ আসে। করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির গতি মন্থর হইয়াছে, ইহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। এই সময় আমরা লক্ষ করিতেছি উন্নয়শীল দেশসমূহ অতি জোরের সঙ্গে বিনিয়োগ আহ্বান করিয়া চলিয়াছে; বলা যায়, দৌড়ঝাঁপ করিতেছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টায় বিশেষ ফল পাওয়া যাইবে বলিয়া আমরা মনে করি না। যেই সকল দেশে বিনিয়োগের জন্য দৌড়ঝাঁপ করা হয় ঐ সকল দেশের বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট পরিমাণ স্টাডি করিয়াই পা ফেলিতে অভ্যস্ত। অপর দিকে উন্নয়নশীল দেশসমূহে ‘সিটি স্ক্যান’ করিলে দেখা যায়, যাহারা অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবান হন, তাহারা সঠিক পথে ব্যবসায়ের বদলে লুটপাট ও দুই নম্বরি করিয়া প্রতিষ্ঠা পাইয়া থাকেন। ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তাহাদের সংগতি পরিলক্ষিত হয় না। 

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে করোনাজনিত সমস্যা একটি বড় অন্তরায়। কিন্তু স্থায়ী বিনিয়োগের বিবেচনার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রহিয়াছে, যাহা অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে উপস্থিত নহে। অর্থাত্, দেশসমূহ বিনিয়োগবান্ধব নহে। অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হইয়া থাকে, An investment always concerns the outlay of some asset—time, money, or effort—in hopes of a greater payoff in the future than what was originally put in. স্বভাবতই বিনিয়োগকারীরা কিছু সুবিধা প্রত্যাশা করিয়া থাকে, যেমন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সুনিশ্চিতকরণ, যথাযথ অবকাঠামোর উপস্থিতি, জটিলতামুক্ত জমিপ্রাপ্তি, সহজ বিদ্যুত্ ও পানির সুবিধা এবং আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয়, উন্নয়নশীল দেশসমূহ উক্ত সুবিধাদি নিশ্চিত করিতে তো পারেই না, উপরন্তু দেখা যায় কর্মে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতি। একটি সুতা নাড়াইতেও ‘উপরি’ প্রদান করিতে হয়। যেই সকল দেশ অত্যন্ত জনবহুল, সেই সকল দেশ তো একই সঙ্গে বড় বাজারও। অথচ শত ডাকাডাকি সত্ত্বেও এই সকল বাজার ধরিতে উন্নত দেশের বিনিয়োগকারীরা উত্সাহিত হন না। প্রাকৃতিক নিয়ম হইল, একটি বাগান থাকিলে সেইখানে ভ্রমর আসিবেই মধু আহরণ করিতে। ধানখেত হইতে ধান সংগ্রহ করা যায় বটে, কিন্তু মধু নহে। এই বাস্তবতা এই উন্নয়নশীল দেশসমূহকে বুঝিতে হইবে। 

তবে এই কথা উন্নয়নশীল সকল দেশের ক্ষেত্রে যে প্রজোয্য নহে, তাহা বলাই বাহুল্য। আমরা লক্ষ করিয়া থাকি, উন্নয়নশীল কিছু দেশে বিনিয়োগ যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক হইয়া উঠিয়াছে। ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার নামোল্লেখ করা যাইতে পারে। কারণ সুস্পষ্ট। এই দেশসমূহ মোটামুটি পরিবেশ গড়িয়া তুলিতে পারিয়াছে। আইনকানুন যথেষ্ট সন্তোষজনক হইয়া উঠিয়াছে। সেই সকল দেশে মানুষেরা পরিশ্রমী হইয়া উঠিয়াছে। সেই সঙ্গে খোঁজ করিলে দেখা যাইবে, অবশ্যই দীর্ঘসূত্রতা পাওয়া যাইবে না। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশসমূহকে উপরিউল্লিখিত প্রতিবন্ধকতাসমূহ সর্বাগ্রে দূর করিতে হইবে। অগ্রাধিকার দিতে হইবে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও দুর্নীতিকে সহনশীল করিয়া তোলা। ঘুষ দুর্নীতি পৃথিবীর সকল দেশেরই অল্পবিস্তর লক্ষ করা যায়, কিন্তু যেই সকল দেশ ‘উপরি’নির্ভর হইয়া পড়ে সেই সকল দেশের অর্থনীতি স্থবির হইয়া যাইতে বাধ্য। উন্নয়নশীল দেশসমূহকে বুঝিতে হইবে, অভ্যন্তরীণ এই সকল সমস্যা দূর করিতে পারিলে না ডাকিতেই বিনিয়োগ হাঁটিয়া হাঁটিয়া প্রবেশ করিবে।