টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত উপকূলীয় জনজীবন

গত কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান  বরিশাল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি এলাকায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে দুর্ভোগে পানিবন্দি মানুষ।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রামে গত চার দিন ধরে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেসঙ্গে পাহাড় ধসের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে নগরীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত ১০৫ পরিবারের চার শতাধিক সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের নগরীর চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে ২৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জ্বল কান্তি পাল ইত্তেফাককে জানান, আজ শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে এবং সেসঙ্গে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী। চকবাজার, কাপাসগোলা, রাহাত্তারপুল, চাঁদগাঁও,                  বাকলিয়া, চাক্তাই, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদের এক্সেস রোড, মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল এবং হালিশহরের নিচু এলাকায় সড়কে পানি জমে যায়। লকডাউনের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কর্মস্থলে যেতে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। রিকশাচালকরা বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে ইচ্ছামতো ভাড়া দাবি করেন। সড়কে  পানি জমে থাকায় পথচারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।  

বরিশাল অফিস জানায়, টানা বৃষ্টিতে বরিশালের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে নদনদীতেও পানি বেড়েছে। প্রতিদিন দুই বেলা জোয়ারের সময় নদনদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। যদিও ভাটার সময় নেমে যাচ্ছে পানি। এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর এবং নদীবন্দরে জারি করা হয়েছে ১ নম্বর সতর্কতা সংকেত। উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে আরো দুই-এক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া বিভাগ। গতকাল দিনভর বৃষ্টিতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বিশেষ করে অতি প্রয়োজনে বের হওয়া পথচারীদের। গতকাল সকাল ৭টায় বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপত্সীমার শূন্য দশমিক ৩০ মিলিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের নিম্বাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলা সদর, লামা, আলিকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের কারণে ও সড়ক বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় ছয় উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলা সদরের ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, অফিসার্স ক্লাব এলাকা, বনানী সমিল এলাকা, মেম্বারপাড়া, হাফেজঘোনা, শেরেবাংলা নগর বালাঘাটা, কালাঘাটা ও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত শত শত বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম জানান, জেলা সদরে বন্যা হলে নিম্নাঞ্চলের লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিরতিহীন বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধসে পড়ছে। নদীর পাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা খাদে যারা অবস্থান করছেন তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম জানান, বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি এবং পাহাড় ধসের শঙ্কা বাড়ছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারে গত পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে জেলার তিন নদী চকরিয়ার মাতামুহুরী, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী ও রামুর বাঁকখালীতে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। ঢল ও বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে প্লাবিত হচ্ছে জেলার ৯ উপজেলার উপকূল, নদীর তীর ও সমতলসহ অর্ধশত ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক গ্রাম। বাড়ির ভেতর পানি জমে  থাকায় হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচটি পাহাড় ধসে ১৩ জন এবং ঢলে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আট জন। পানিবন্দি পরিবারগুলো তিন দিন ধরে চুলা জ্বালাতে পারছেন না। খাবার কষ্টে আছেন ভুক্তভোগীরা। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বুধবার থেকে রামুর চারটি সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের অভিযোগ অতি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকখালী নদী ড্রেজিংয়ের ব্যাপক অনিয়মের খেসারত দিচ্ছেন নদীর দুই তীরের অধিবাসীরা।

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, তিন দিনের ভারী বর্ষণে শ্যামনগরের ১২টি ইউনিয়নে অধিকাংশ মাছের ঘের তলিয়ে একাকার হয়ে গেছে। মাছ ভেসে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে চাষিদের। তলিয়ে গেছে কৃষকের বীজতলা। উপজেলা মত্স্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর উপজেলায় ১৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মাছ চাষ করা হয়। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের চিংড়ি ঘের তলিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ক্ষতির কবলে পড়েছেন চাষিরা।

শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, টানা চার দিনের অবিরাম বর্ষণে শরণখোলার মাঠঘাট ও বাড়িঘর পানিতে থইথই করছে। মানুষের জীবনযাত্রা থমকে গেছে। গতকাল  বিকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. আজিজুর রহমান উপজেলার বন্যাকবলিত রাজৈর, কদমতলা, খাদা, উত্তর তাফালবাড়ী, নলবুনিয়া এবং গোলবুনিয়ার আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার ও চাল বিতরণ করেন।

সাতকানিয়া ( চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কিছু স্থানে পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। তলিয়ে গেছে আমনচারা ও ফসলি জমি।  এরই মধ্যে উপজেলার সোনাকানিয়া, আমিলাইষ ও চরতী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে খাল ও নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।