পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইন 'জাতিগত নিধনের সমতুল্য'

পাকিস্তানের বিতর্কিত আইন সম্পর্কিত একটি সম্মেলনে বলা হয়েছিল ব্লাসফেমি আইনটিকে জাতিগত নির্মূলের সমান করা হয়েছে। একে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির মানবাধিকার কর্মীরা৷

পাকিস্তানের ইসলাম ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা রক্ষার লক্ষ্যে অস্পষ্টভাবে প্রণীত ব্লাসফেমি আইনগুলোর পুলিশ এবং বিচার বিভাগ নির্বিচারে প্রয়োগ করছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশেই ‘ব্লাসফেমি', ‘ধর্মীয় অবমাননা' এবং ‘ধর্মত্যাগ' শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ বাস্তবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা, জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রেও হাতিয়ার করা হয় এসব আইনকে৷

প্রায় ১০ বছর ধরে গৃহবন্দী ছিলেন আসিয়া বিবি৷ শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে অব্যাহতি দেয়৷ আসিয়া বিবির এ ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷

কিন্তু ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তাকে কী পরিমাণ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে, তা জানেন না বিশ্ববাসী৷ ২০১৯ সালের মে মাসে পাকিস্তান ছেড়ে ক্যানাডায় চলে যান আসিয়া বিবি৷ সেখানেও তাকে দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়৷ আসিয়াকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়ে এক ভিডিও পোস্ট করে এক ধর্মীয় উগ্রপন্থি৷ এখনও নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আসিয়া৷

পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত অবরোধের মধ্যে জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকলেও তা  কেবল কাগজে কলমে। হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, আহমদি এমনকি শিয়ারাও দেশটিতে অ-নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হয়। তাদের কথা বলার অধিকার নেই। আইনের সুরক্ষার অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।  

গতবছরের সেপ্টেম্বরে ব্লাসফেমি বা ধর্মনিন্দার অভিযোগে এক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে পাকিস্তানের আদালত৷ ৩৭ বছরের ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইসলাম নিয়ে ‘অন্যায়’ এবং ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করেছেন তিনি৷ যদিও তার আইনজীবীর দাবি, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে না চাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ধর্মনিন্দার অভিযোগ করা হয়৷ প্রায় সাত বছর ধরে বিচার চলার পরে নিম্ন আদালত তাকে ফাঁসির সাজা দেয়৷

এছাড়াও গতবছরের জুলাই মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে তাহির নামিস নামে একজনকে বিচার চলাকালে আদালতকক্ষের ভিতরেই গুলি করে হত্যা করা হয়৷ তার বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ আনা হয়েছিল৷ ঐ ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় বিবৃতি দিয়ে নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ হত্যাকারীকে ‘ধর্ম যোদ্ধা’ অ্যাখ্যা দিয়ে তার মুক্তির দাবিতে তখন মিছিলও করে কয়েক হাজার কট্টর সমর্থক৷

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের গ্রহণ করা মূলনীতিকেও অগ্রাহ্য করে এসব নীতি৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যা ও বীভৎস যুদ্ধাপরাধের বিপরীতে গিয়ে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস গ্রহণ করা হয়৷ তা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন নৃশংসতা এখনও ঘটে, এবং মানবাধিকারই সবার আগে ভূলুণ্ঠিত হয়৷ ‘ব্লাসফেমি', ‘ধর্মের অবমাননা' এবং ‘ধর্মত্যাগ' নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ ও সহিংসতাকেই উসকে দেয়৷ 

ইত্তেফাক/এএইচপি