ঝোঁ কটা ছিল ছোট থেকেই। আর এই ঝোঁকই একসময় পরিণত হয় নেশায়। ফলে সময়ের পরিবর্তনে একজন নারী, একজন চাকরিজীবী, একজন স্ত্রী, একজন মা—সব পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে উঠলেন ফ্যাশন উদ্যোক্তা। শুরুতে ছোট পরিসরে শুরু হলেও এখন অবয়ব বেড়েছে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে বেশ কয়েকজনের। ঘরোয়াভাবে শুরু হওয়া থেকে একটি ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন ফ্যাশন শপ ‘র্যাপ’ এর স্বত্বাধিকারী রাখী গাঙ্গুলী।
সালটা ছিল ২০০০। মাত্র পড়াশুনার পাঠ চুকে এক প্রতিষ্ঠানে গণসংযোগ বিভাগে কাজ শুরু করি। মাসখানেক পর এক বিদেশি দূতাবাসে চাকরি হলো। পাশাপাশি চলত ফ্রিল্যান্স সাইকোলজিস্ট হিসাবে কাউন্সেলিংয়ের কাজ। ২০০২ সালে বিয়ের পর দেখলাম চাকরি আর সংসার একসঙ্গে, কিছুটা কঠিন বটে। চাকরি ছেড়ে দিলাম। ছোট বেলা থেকেই ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহ, সংগ্রহে থাকা যাবতীয় ফ্যাশন ম্যাগাজিন উলটেপালটে দেখলাম। এর সঙ্গে যোগ হলো ভারত সফরের অভিজ্ঞতা। প্রায়ই আমাদের ভারতে যাওয়া হতো। সেখান থেকে কাপড় কিনে আনতাম। কিছু ব্যবহার করতাম আর কিছু ব্যবহার করা হতো না। অব্যবহূতগুলো বিক্রি করে দেওয়ার জন্য আমার স্বামীর কাছ থেকে প্রথম উত্সাহ পেলাম। আশপাশের অনেকের কাছে বিক্রি করলাম। যারা নিলেন পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে যে প্রশংসা পেয়েছি সেটাই আমার ব্যবসা শুরুর পুঁজি বলা যেতে পারে। সেটাই জীবনে আনল এক নতুন বাঁক। ২০১২ সালে একটা শোরুম নিলাম। তবে ছয় মাস সেটি ফেলে রাখলাম। কারণ, শোরুমে ব্যবসা শুরুর জন্য মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। আমার ছেলে তখন ছোট। তারপরও কেন যেন নেশায় পেয়ে বসল। শুরু করলাম যাত্রা। মণিপুরীপাড়ায় ‘র্যাপ ডিজাইনার বুটিক’ এখন বেশ পরিচিত শোরুম।
কোঁকড়া চুলের অধিকারিণী রাখী তার ব্যতিক্রমী স্টাইলের কারণে আজ সফল উদ্যোক্তা। তার শোরুমে যখন কোনো ক্রেতা যান, দেখেন উদ্যোক্তা নিজেই স্টাইলিস্ট, স্মার্ট, তদুপরি ক্রেতাকে পরামর্শ দিচ্ছেন কোন পোশাকটি মানানসই হবে—একজন ক্রেতার সেই আবহে ভালো লাগাই তৈরি হয়। তখন আর ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক থাকে না, মনে হয় আপনজনের কাছ থেকেই কিছু কিনছেন। সেজন্যই রাখী গাঙ্গুলী ব্যতিক্রম। জানালেন, সেই শিক্ষাজীবনেও তাই ছিলেন। ব্যতিক্রমী স্টাইলের কারণে শিক্ষকরাও কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। এত স্টাইল করে সময় নষ্ট করতে গিয়ে যদি রেজাল্টটাই ভালো না হয়। তারপর, যখন ফার্স্টক্লাস পেলাম তখন তো সবাই খুব খুশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পর প্রশিক্ষণ নিতেও ভুলেননি তিনি। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। যা জীবনে ব্যাপকভাবে কাজে লাগছে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদের ক্ষেত্রেও তিনি মনে করেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। ব্যবসায় পুরোপুরি মনোযোগ তথা লেগে থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা করতে গেলে কোন বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দরকার সে বিষয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, যে কোনো ব্যবসার জন্য সিক্স সেন্স থাকতে হয়। যেখানে কাস্টমারের চাহিদার দিকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে তাদের ক্রয়ক্ষমতার দিকটাও দেখতে হবে। সেটার সঙ্গে তাদের মানসিকতার একটা বিচার আছে। এগুলোর সমন্বয় করতে হয়। এরপর পণ্যটি প্রেজেন্টেশন করতে হয়। তাহলেই সাফল্য আসবে। আর ব্যবসায় বড় কৌশল হচ্ছে সততা। একই সঙ্গে মানসম্মত পণ্য দিয়ে ক্রেতার মন জয় করা। সেটি করতে পারলে ক্রেতাকে খুঁজে বের করার দরকার হয় না।
নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক বাধা রয়েছে, তথাপিও নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের আরো বেশি এগিয়ে নিতে সরকারি নীতি সহায়তা দরকার। বিভিন্ন ব্যাংকে কাগজে-কলমে নারী উদ্যোক্তাদের কথা থাকলেও বাস্তবে সেবার ক্ষেত্রটা ঠিক ততটা পরিষ্কার নয়। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদের ঋণসহায়তা দরকার। করোনাকালীন সরকারঘোষিত প্রণোদনা সুবিধা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা যাতে পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
করোনার এ কঠিন সময়ে আগের বছরের চেয়ে ব্যবসা কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প চিন্তা করতে হবে। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন বেজড কাস্টমার গড়ে তুলতে হবে। সেটা করতে পারলে ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসতে হবে না। নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি তার আহ্বান সবাই প্রযুক্তির সঙ্গে খাপখাইয়ে চলার চেষ্টা করবেন, তবেই আগামী দিনগুলোতে ভালো থাকবেন।
—সাক্ষাত্কার :ইসরাত জাহান প্রিয়াংকা