ঢাকা থিয়েটার ও আমার কয়েক স্মৃতিখণ্ড

আফজাল হোসেন

ঢাকা থিয়েটারের শুরু থেকে আজ অবধি যারা যারা কাজ করেছেন। এদেশের শিল্প জগতে তারা স্ব স্ব স্থানে বরেণ্য হয়েছেন। দারুণ সমৃদ্ধ এক স্মৃতির ভেতর দিয়েই তাই আজকের ঢাকা থিয়েটারের বর্তমান। থিয়েটারের ৪ যুগপূর্তি উপলক্ষে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, অভিনেতা, নির্দেশক ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন

ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠার তারিখ ২৯ জুলাই। দলের বয়স এখন ৪৮ বছর। আমি দলে যোগ দিই প্রতিষ্ঠার ১ বছর পর, ১৯৭৪-এ। সে বছর মহা-সমারোহে আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার রজতজয়ন্তী উত্সব পালন করা হবে, জোর তোড়জোর চলছে। হবে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান। আমি তখন কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। উত্সব উদযাপন কমিটি হয়েছে। নবী স্যার, শিল্পী রফিকুন্নবী আমাদের কমিটির প্রধান। স্যারকে রাজি করানো হয়েছে, নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে শেষের দিন একটি নাটকও মঞ্চস্থ হবে।

শিল্পী শাহাবুদ্দীন ছাত্র সংসদের সভাপতি, আর সুবীর চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক। তারা পাণ্ডুলিপি জোগাড়ের দায়িত্ব দিলেন মারুফ আহমেদের ওপর। মারুফ আহমেদ বিখ্যাত অভিনেতা ইনাম আহমেদের পুত্র। নিজেও তখন আর্ট কলেজের ছাত্র এবং সদ্য সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। ছবির নাম ‘আবার তোরা মানুষ হ’। সে চলচ্চিত্রের নির্মাতা বিখ্যাত অভিনেতা, পরিচালক, গায়ক ও সুরকার খান আতাউর রহমান।

আল মনসুর- যিনিও অভিনয় করেছেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রে। অভিনেতা হিসাবে আল মনসুর সেই সময়ে প্রবল খ্যাতিমান। টেলিভিশনের দর্শক তার নিজস্বরীতির অভিনয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখে এবং টেলিভিশন নাট্যকার হিসাবেও তখন খুবই সফল, জনপ্রিয় তিনি। সেই দারুণ দীপ্তিময় তারকাকে দিয়ে মারুফ ভাই লিখিয়ে আনলেন নাটক ‘বিদায় মোনালিসা’। মহড়া শুরু হয়ে গেল। আমি অভিনয় নয়, আয়োজনের তদারকি করি। খুবই উত্তেজিত, কলেজে প্রথম নাটক হতে চলেছে। নাটকে প্রধান পুরুষ চরিত্র দুটি। একটিতে মারুফ আহমেদ নিজে অভিনয় করছেন, অন্য চরিত্রে আমার ক্লাসেরই একজন নিয়মিত মহড়ায় অংশ নিচ্ছিল। হঠাত্ বোধহয় ভয় পেয়েই রিহার্সেলে আসা বন্ধ করে দেয় সে।

কলেজের অনুষ্ঠানগুলোয় তখন কবিতা আবৃত্তি করতাম। আমাকেই বলা হলো অভিনয়ের জন্য দাঁড়িয়ে যেতে।

বিদায় মোনালিসা মঞ্চস্থ হয় ছাত্র শিক্ষক মিলনকেন্দ্র, টিএসসিতে। সেই নাটক মঞ্চায়নে নেপথ্য সহযোগিতা দেয় ঢাকা থিয়েটার। নাটক শেষে রোগা লম্বা একটা লোক এসে বললেন, ‘ভালো অভিনয় করেছেন।’ তারপর প্রশ্ন, সিরিয়াসলি অভিনয় করতে চাই কি-না?

একটা কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে জায়গাটা কোথায় চিনিয়ে দিলেন। ডিআইটির উল্টো দিকে ডিডিএসএ মিলনায়তন রয়েছে। সেখানে রোজ বিকেলে রিহার্সেল হয়, যেতে বলা হলো আমাকে।

জেনেছিলাম, তার নাম নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। খুবই নামকরা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তিনি। সবাই ডাকে বাচ্চুভাই বলে। তিনি ঢাকা থিয়েটারের দলনেতা। খুবই সম্মানিতবোধ করি, এ রকম একজন মানুষ অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। তাদের দলের নাটকের রিহার্সেলে যেতে বলেছেন।

গিয়েছিলাম, রিকশা চড়ে ডিআইটি পার হয়ে রাস্তার উল্টো দিকে ডিডিএসএ লেখা সাইনবোর্ড খুঁজছি। চোখে পড়ে একদল মানুষ ফুটপাতের ওপর জড়ো হয়ে আড্ডায় মেতে আছে। অনেকগুলো মুখ খুবই চেনা, তাদের টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়। ভয়ে আমি দিশেহারা। কী করা উচিত! নামবো, নাকি নামবো না।

রিকশাওয়ালার প্রশ্ন-কই নামবেন?

নামতে পারিনি সেদিন। সাহস হয়নি। কিন্তু যে মানুষটা শতমাইল দূরের এক শিয়াল ডাকা গ্রাম থেকে এই ঝলমলে শহরের কেউ একজন হতে এসেছিল, তার তো সাহসেরই দরকার ছিল। সেই সাহস, আত্মবিশ্বাস তার পাওয়ার কথা ঢাকা থিয়েটার থেকে। জগত্ কত রহস্যে পূর্ণ। দ্বিতীয়বার ঢাকা থিয়েটার, তাদের রিহার্সেলমুখো হওয়ার ইচ্ছা তখন যুবকের মনে নেই।

আর্ট কলেজের উল্টো দিকের একটা চা দোকানে আমরা চা খেতে যাই প্রায়ই। একদিন সেখানে হাজির হলেন হাবিবুল হাসান। বিখ্যাত মানুষ। টেলিভিশনের জন্য নাটক লেখেন, অভিনয় করেন। তিনি যে ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত, জানতাম না। আমাকে দেখে খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন-অই মিয়া আপনে বিদায় মোনালিসাতে অভিনয় করছিলেন না?

-হ্যাঁ।

চমকে যাই সে উত্তরের পরের কাণ্ডে। হাবিবুল হাসান আমার নাকের ডগায় এসে তুড়ি মারেন।

-আপনের না ঢাকা থিয়েটারের রিহার্সেলে যাওনের কথা। যান নাই ক্যান?

থতমত খাওয়া প্রশ্ন। মুখে কথা নেই, তাকিয়ে রয়েছি।

-অহন আমরা রিহার্সেল করি টিএসসিতে। চলেন, অহনই আমার লগে যাইবেন আপনি। আইজ ছাড়াছাড়ি নাই।

ছাড় মেলেনি। সেদিনই প্রথম যুক্ত হই ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে।

এখন হাবিবুল হাসানকে কম মানুষের মনে পড়বে।

আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা তার প্রতি। নিজের থিয়েটার অভিজ্ঞতা, দুঃখ-সুখ, গ্লানি-গৌরবের যে জীবন, উপলব্ধি মিলেছে ঢাকা থিয়েটার, অসাধারণ এক দল মানুষ ও তাদের সঙ্গ সান্নিধ্যের কারণেই। তবে সেদিন ধরে বেঁধে কেউ একজন নিয়ে এসেছিল বলেই এখন ঢাকা থিয়েটার ও সে মানুষদের নিয়ে গৌরব করতে পারি।

লেখক : দেশবরেণ্য অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী