কুইনিন সারাইবে কে?

নিম্নচাপের কারণে বিগত কয়েক দিন ধরিয়া বরিশাল জুড়িয়া প্রবল বৃষ্টিপাত হইতেছে। ইহাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ইউনিটের সামনে তৈরি হইয়াছে এক নরক গুলজার পরিবেশ। ইত্তেফাকে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট এই করোনা ইউনিটের সামনে যত্রতত্র ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা করোনা ওয়ার্ডে ব্যবহূত মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভসসহ যাবতীয় সামগ্রী বৃষ্টিতে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বিপুল পরিমাণ করোনা বর্জ্যে সয়লাব হইয়া গিয়াছে পুরো ক্যাম্পাস। এই সকল বর্জ্য পায়ে মাড়াইয়াই শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনসহ হাসপাতালের মূল ভবনের রোগীরাও যাতায়াত করিতে বাধ্য হইতেছেন। এমনকি করোনার নমুনা পরীক্ষা করিতে আসা লোকজনও একইভাবে যাতায়াত করিতেছেন সেইখান দিয়া। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহাতে করোনা আরো ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে।

বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাহার ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে বলিয়াছিলেন, ‘কুইনিন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনিন সারাবে কে?’ আসলে কুইনিন (কুইনাইন) দিয়া দ্রুত ম্যালেরিয়া হইতে নিরাময় লাভ করা গেলেও কুইনাইন এমনই তিক্ততায় ভরা যে, ম্যালেরিয়া ভালো হইয়া গেলেও কুইনাইনের তিতার কারণে রোগীরা যাহার-পর-নাই কাহিল হইয়া পড়িত। শেবাচিমের করোনা ইউনিটের অবস্থাও তথৈবচ। মানুষ নিজেকে সুস্থ করিতে হাসপাতালে আসিয়া যদি উহার পরিবেশে আরো অসুস্থ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে সেই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উচিত ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা, নচেত্ দায় স্বীকার করিয়া পদত্যাগ করা। কিন্তু দেশটির নাম যেহেতু বাংলাদেশ, সেই কারণে এইখানে দায়িত্বশীলদের অজুহাতের সীমা-পরিসীমা থাকে না। এই ক্ষেত্রেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও দায় সারিয়াছে বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের কথা বলিয়া। সিটি করপোরেশনের সহিত বারবার কথা হইলেও ঐ বর্জ্য পরিষ্কারের বিষয়ে তাহারা সমাধানে পৌঁছাইতে পারে নাই। সেই কারণে করোনা রোগী ও স্বজনদের ব্যবহূত বর্জ্য করোনা ইউনিটের সামনেই ফেলা হইতেছে!

কী ভয়াবহ কথা! সিটি করপোরেশন বর্জ্য লইতে পারিতেছে বিধায় করোনার মতো বিপজ্জনক বর্জ্য কিনা নিরাপদ কোথাও ফেলিবার কোনো ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লইতে পারিল না? ইহা তো চোরের উপর রাগ করিয়া মাটিতে বসিয়া ভাত খাওয়া! এখন হাসপাতালে গিয়াই যদি মানুষ রোগগ্রস্ত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে মানুষ কোথায় যাইবে? বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে শের-ই-বাংলা চিকিত্সা মহাবিদ্যালয়ই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চিকিত্সাকেন্দ্র। বরিশাল বিভাগে আরো একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ (পটুয়াখালী) নূতন চালু হইয়াছে বটে, তবে তাহার শয্যা ও চিকিত্সাব্যবস্থা এখনো সীমিত পর্যায়ে, যাহার সহিত শেবাচিমের তুলনাই চলিতে পারে না। সুতরাং শেবাচিম এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান, যাহা বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার ২৪টি পৌর এলাকা, ৪১টি উপজেলা, ৩৫২টি ইউনিয়ন এবং ৪ হাজার ১৯৫টি গ্রামের কোটি লোকের চিকিত্সাসেবার প্রধান কেন্দ্র। সুতরাং এত বড় দায়িত্বশীল একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যদি লোকবলের সংকটের অজুহাতের কথা বলিয়া করোনা ইউনিটের বর্জ্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপসারণ করিতে না পারেন, তাহা হইলে তাহারা কেন দায়িত্বে রহিয়াছেন?

প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখভাল করিবার জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী রহিয়াছেন সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রের কার্যসম্পাদনের জন্য। ইহা ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিরা রহিয়াছেন। এই ক্ষেত্রে স্তরে স্তরে এত দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন, তাহারা কী করিয়া এত দায়িত্বহীন হন? অনেক সিটি এলাকেই সিটি করপোরেশন নিজেরাই ময়লার ভাগাড়। সেই কারণে বরিশালের সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষ সম্ভবত শেবাচিমের করোনা ইউনিটের বর্জ্যকে কোনো সমস্যাই মনে করিতেছেন না। কোনো কোনো জেলা-উপজেলায় চেয়ারম্যানরা তো নিজের ঠিকাদারি কাজ বা ব্যবসা লইয়াই অধিক ব্যস্ত থাকেন। এখন সরকারি কর্মকর্তারাও যদি দায়িত্ব পালন না করেন, আবার বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও যদি দায়িত্বের ধারেকাছে না যান, তাহা হইলে উপায় কী? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই দেশকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কাহারও সাধ্যি নাই সঠিক পথে আনিবার।