একের পর এক করোনার ঢেউ জীবনের সব রং যেন শুষে নিয়েছে। গত দেড় বছরে সংক্রমণ কমে আসার পর কিছুটা সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও পরবর্তী ঢেউয়ে আবারও বন্দিজীবনে নিজেকে আটকে ফেলতে হয়েছে। প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা অচিরেই এই মহামারি কেটে গিয়ে সারা বিশ্ব ফিরে পাবে তার পুরোনো ছন্দ। কিন্তু সেই দিন কবে আসবে তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউ।
আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া বন্ধ, বন্ধ যে কোনো পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান। বন্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চগুলো। খাঁখাঁ করছে সব সময় তরুণদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকা টিএসসি, শাহবাগ চত্বর। রেস্টুরেন্টগুলোতে তালা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দাওয়াত দিলেও বাসায় কেউ আসতে চাইছে না। জীবন যেন থমকে আছে ঘরের চার দেওয়ালে। সেই জীবন অনিশ্চয়তায় মোড়া।
এদিকে, রাজধানীতে প্রায় নিয়মিই চলতে থাকে একের পর এক উত্সব। আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব, ঢাকা লিট ফেস্ট, বর্ষা উত্সব, নাট্য উত্সব—কত কিছুই না আয়োজন করা হয়। কিন্তু তার সবকিছুই বন্ধ। রাজধানীর আনাচকানাচে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সেন্টারগুলো ফাঁকা, শপিং সেন্টারগুলোতেও নেই কোনাকাটার জৌলুশ। সবাই প্রতীক্ষায় আছে কবে কাটবে এই করোনার অমানিশা।
৫ আগস্ট এ পর্যায়ের লকডাউনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলেই যে করোনা পরিস্থিতি কমে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। ফলে, লকডাউন বা বিধিনিষেধ আরো বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তাও আরো দীর্ঘতর হবে।
আর সবকিছুর মতোই পুরোপুরি বন্ধ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চগুলো জনমানবশূন্য। শহিদ মিনার, টিএসসি, শাহবাগ প্রতিটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নির্জন, সুনসান। করোনার ছোবলে একেবারেই থমকে গেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। শুধু তা-ই নয়, টিভিতে যেসব নাটক প্রচারিত হয়, থমকে গেছে সেসবের শুটিং। এ পরিস্থিতিতে শিল্পী-কলাকুশলীরাও রয়েছেন মহাসংকটে।
করোনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গ্রামে গ্রামে। প্রতিদিন মৃত্যুর রেকর্ড, আক্রান্তের রেকর্ড হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে যারা এখনো আক্রান্ত হননি তারা সৌভাগ্যবান হলেও মানসিক চাপে আছেন সন্দেহ নেই। ঘরে থাকলে শুধু তো আক্রান্ত হওয়ার ভয় কাজ করে না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় চাকরিহীনতার আতঙ্ক, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সব মিলিয়ে মানসিক চাপে ভুগছেন প্রতিটি মানুষ। শুধু বড়রা নন, শিশুরাও ভুগছে মানসিক চাপে। এতটা সময় ঘরবন্দির প্রভাব পড়েছে তাদের মনে, শরীরে। খেলাধুলা তো বন্ধই, স্কুলে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে যেটুকু দেখা হতো সেটাও একেবারেই বন্ধ। ঘরে থাকতে থাকতে তারা অস্থির, অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা যে কবে কাটবে তার উত্তর তো জানা নেই কারোই। একঘেয়ে ঘরবন্দি জীবন শিশু-কিশোরদের বিরক্তির চরম সীমায় নিয়ে এসেছে। যদিও তারা ভিডিও গেম, কার্টুন, মুভি নিয়ে ব্যস্ত। ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু স্কুল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় মানসিক অবসাদে ভুগছে তারাও।
মানুষ একা থাকতে পারে না। আমাদের সব সময় মানুষের সঙ্গেই প্রতিদিন কাটাতে হয়। প্রতিদিনের জীবন চলে নির্দিষ্ট ছকে। করোনা মহামারির জন্য সেই নির্দিষ্ট ছকটাই গেছে ওলটপালট হয়ে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মেলামেশাটাই গেছে বন্ধ হয়ে। ফলে, ঘরে পরিবারের সঙ্গে থেকেও আমরা কখনো কখনো একা বোধ করছি। গ্রাস করছে বিষণ্নতা। এই ঘরবন্দি অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন আত্মীয়স্বজন একে অপরের সঙ্গে হঠাত্ করেই রূঢ় আচরণ করে ফেলছি।
এদিকে, বয়স্ক মানুষরা পরিবারের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছেন। তারা বের হতে পারছেন না। করোনায় আক্রান্ত হলে বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি থাকায় এই পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা। ভালোর জন্য বলা হলেও এই ঘরে বসে থাকা আর ভালো লাগছে না ছেলের বাসায় থাকা লিয়াকত আলীর। তিনি বললেন, ‘আমি তো ঘরে থেকেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। করোনা না ধরলেও তো মানসিক রোগী হয়ে যাব। সন্ধ্যায় পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়ে অনেকের সঙ্গে আড্ডা দিতাম। এখন সব বন্ধ। খুব খারাপ লাগে। ঘুমানো, খাওয়া আর টিভি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।’
ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক, পারিবারিক অনুষ্ঠান সবকিছুতেই এসেছে স্থবিরতা। ধানমন্ডির হোয়াইট প্যালেস কমিউনিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপক ফজলুল হক জানান, করোনার পরে বিয়ের আয়োজন বন্ধই প্রায়। কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া অর্ধেক করে দিয়েও ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক স্টাফ ছাঁটাই করা হয়েছে। এর পরও টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। শীতের সময় কিছুটা ব্যবসা হয়েছিল। কিন্তু করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকায় সবাই বুকিং ক্যানসেল করছেন।
ধানমন্ডির স্টার কাবাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক জানালেন, আমাদের রেস্টুরেন্টে মানুষ তো শুধু খেতে আসেন না। খাওয়ার ফাঁকে অনেকটাই বন্ধুদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। সেটা তো একেবারেই নেই। পার্সেল খাবার বিক্রি হচ্ছে। তবে সেটা আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই কম।