অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন আলী আশরাফ

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রবীণ সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আলী আশরাফ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত গতকাল শুক্রবার বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে শেষ যুদ্ধে হেরে গেলেন এই জীবনযোদ্ধা।

চলতি একাদশ সংসদের সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন মরহুম আলী আশরাফ। সবার কাছে পরিচিত ছিলেন ‘আশরাফ ভাই’ হিসেবে। জাতীয় বাজেটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে তার জ্ঞানগর্ভ ও সাবলীল বক্তব্য সবার নজর কাড়ত। পাঁচ বারের সংসদ সদস্য, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, উচ্চ শিক্ষিত, সুবক্তা, মাটি ও মানুষের নেতা এবং সজ্জন মানুষ হিসেবে সমাদৃত আলী আশরাফের মৃত্যুতে তার নির্বাচনি এলাকা ছাড়াও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। এক পুত্র ও চার কন্যা ছাড়াও তিনি অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী এবং শুভান্যুধায়ী রেখে গেছেন।

গত ২১ জুলাই কোরবানির ঈদের দিন বিকাল ৩টায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার পর থেকে দৈনিক ইত্তেফাক সার্বক্ষণিক আলী আশরাফের শারীরিক অবস্থার খোঁজ রাখছিল। প্রতিদিন ইত্তেফাকে তার স্বাস্থ্যের আপডেট ছাপা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় গতকালও ইত্তেফাকে তার ছবিসহ স্বাস্থ্যের আপডেট ছাপা হয়।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে আলী আশরাফের একমাত্র ছেলে ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মুনতাকিম আশরাফ টিটুটে ফোন করে সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও সমবেদনা জানান। রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন ফোন করেন টিটুকে।

অধ্যাপক আলী আশরাফের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় বলেছেন, ‘অধ্যাপক আলী আশরাফের পেশাদারিত্ব এবং অভিজ্ঞতা সংসদীয় গণতন্ত্রের                 চর্চায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। সরকারি প্রতিশ্রুতি এবং সরকারি হিসাব কমিটিসহ বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি এবং সংসদীয় কার্যক্রমে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারাল। তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও জনমানুষের নেতা অধ্যাপক আলী আশরাফের মৃত্যুতে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক সৈনিক এবং দেশপ্রেমিক জননেতাকে হারালাম।’ প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত  পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

অধ্যাপক আলী আশরাফের ছেলে টিটু গতকাল বিকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইত্তেফাককে জানান, পিত্তথলিতে জমা পাথর অপসারণের জন্য ১০ জুলাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়লে কেবিন থেকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সংক্রমণ কমাতে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলেও উন্নতি হয়নি। সর্বশেষ নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। গত ২১ জুলাই ঈদের দিন বিকাল ৩টায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। তবে তার করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ ছিল। চিকিত্সকদের পরামর্শে ভারত থেকে গত ২৩ জুলাই ২১টি উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন আনা হয়। আগে থেকে ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন তিনি। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার পর থেকে তার রক্তে প্লাটিলেট কমতে থাকে, এজন্য রক্ত দেওয়া হয়েছে নিয়মিত। ওঠানামা করে রক্তচাপ। কিডনি বিকল হওয়ায় ডায়ালাইসিস করানো হয়। রক্তে হিমোগ্লোবিনও কমে যায়। লাইফ সাপোর্টে শতভাগ ভেন্টিলেটরনির্ভর ছিলেন। সর্বশেষ প্লাজমা দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিত্সকদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে তার বাবার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন আশরাফপুত্র টিটু।

জানাজা ও দাফন

গতকাল রাতে বাদ এশা রাজধানীর গুলশানে আজাদ মসজিদে মরহুম অধ্যাপক আলী আশরাফের প্রথম নামাজে জানাজা হয়েছে। রাতে মরদেহ রাখা হয়েছে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে। আজ শনিবার মরদেহ নেওয়া হবে তার নির্বাচনি এলাকা চান্দিনায়। সেখানে সকাল ১১টায় চান্দিনা মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে, বাদ জোহর দোল্লাই নবাবপুর আহসান উল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবং বাদ আসর গল্লাই ইসমাইল দাখিল মাদ্রাসা মাঠে চতুর্থ নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

শোক জানিয়েছেন যারা

আলী আশরাফের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোক জানান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়কমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম পৃথক শোকবার্তায় শোক জানিয়েছেন। সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, সংসদের হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এবং আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জি. আবদুস সবুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোক জানান।

জাতীয় পার্টি-জেপির শোক

অধ্যাপক আলী আশরাফের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, ‘আলী আশরাফ ছিলেন একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার ইন্তেকালে দেশ একজন দেশপ্রেমিক জননেতা ও বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারালো।’ জেপির নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

অন্যদের শোক

জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি পৃথক বিবৃতিতে গভীর শোক জানিয়েছেন। শোক জানান বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

আলী আশরাফের সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর কুমিল্লার চান্দিনার গল্লাই গ্রামে আলী আশরাফের জন্ম। গল্লাই মুন্সিবাড়ির মরহুম মো. ইসমাইল হোসেন মুন্সির ছেলে আলী আশরাফ ১৯৬২ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৭০-এর পাকিস্তান সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘মই’ প্রতীকে অংশ নেন। ঐ নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও ‘মাছ’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ১৯৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। পরে কুমিল্লা-৭ আসন  থেকে ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

একসময় কলেজে অধ্যাপনা করা আলী আশরাফ ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ছিলেন। ২০০১ সালে সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার থেকে স্পিকারের দায়িত্ব পান। ঐ সময় ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পান আলী আশরাফ। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন একসময়। ব্যবসায়ীদেয় শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন কমিশনার হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।