ইকোসাইড বা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তুলনা করেছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বিচারের জন্য এ ধরনের অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে অন্তর্ভুক্তকরণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
আদালত বলেছে, পরিবেশের ধ্বংস মূলত বেশি সংঘটিত হয় মানুষে মানুষে হানাহানির কারণে। আধুনিক উদাহরণ—ইরাক, সিরিয়া এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধ। প্রতিটি যুদ্ধই মানুষ হত্যার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালা, প্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করে। একটি সম্প্রদায়কে, একটি জাতিকে, একটি গোষ্ঠীকে, একটি সংখ্যালঘু ধর্মীয় মতাবলম্বীকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী পক্ষ বা গোষ্ঠী কর্তৃক নির্মূল বা ধ্বংস বা হত্যা করা জেনোসাইড। তেমনি ইকোসাইড হলো—জীববৈচিত্র্য, প্রাণীজগৎ, পাখি, গাছপালাসহ যে কোনো প্রাণকে হত্যা করা। সেজন্য ইকোসাইডকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টে অন্তর্ভুক্তের কথা বলেছে হাইকোর্ট।
১৯৭৩ সালে প্রণীত এই আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি যে কোনো দল বা সংগঠনেরও (একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ) বিচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এখন পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার এক মামলার রায়ে ইকোসাইডকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৩ ধারায় অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছে হাইকোর্ট। ঐ ধারায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক্তিয়ার ও অপরাধসমূহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের এই রায় অনুযায়ী সরকার যদি ইকোসাইডকে ঐ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে। সময়ের প্রয়োজনে এটা খুবই দরকার।
বর্তমানে পরিবেশ এবং জলবায়ুর ওপর আঘাতকে ইকোসাইড হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্তের বিশ্বব্যাপী আন্দোলন এবং দাবি চলমান।
ইকোসাইড ধারণাটি প্রথম ব্যবহার হয় ১৯৭০ সালে। এরপর থেকে সারা বিশ্বের সব পরিবেশবাদী এবং আইনজীবীরা এই ইকোসাইড ধারণাকে আইনে রূপান্তরের নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।
বাংলাদেশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের পরিবেশবান্ধব উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে ১৪ দফা সুপারিশ করেছে হাইকোর্ট। এসব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতেও সরকারকে বলা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বনাম সরকার ও অন্যান্য’ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এই সুপারিশ করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, পরিবেশের অপর নাম শান্তি। পরিবেশ সম্মত শাসনব্যবস্থা তথা পরিবেশকে সুরক্ষাকারী শাসন ব্যবস্থা যেমনি বিবাদ ও বিরোধ কমিয়ে আনে তেমনি স্থানীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। তাই সব উন্নয়ন পরিকল্পনায় ইকোসেন্ট্রিক (প্রকৃতিকেন্দ্রিক) পন্থা গ্রহণ করা দরকার।
এদিকে ইকোসাইডকে গণহত্যার মতো অপরাধ বিবেচনা করে তা বিচারে নতুন আইন প্রণয়ন বা ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংযোজনের পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত ঐ বৈঠকে বলা হয়েছে, গণহত্যা যেমন অপরাধ, ইকোসিস্টেম ধ্বংসও তেমন এক ধরনের অপরাধ। সেজন্য ইকোসাইডকে অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের পরিমাণ ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৯০৭ একর। এর মধ্যে বন বিভাগের রেকর্ড করা জমির পরিমাণ ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৬৩ একর। তিন পার্বত্য জেলা ও সুন্দরবনের সংরক্ষিত জরিপ বহির্ভূত ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ একর। অবশিষ্ট ৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৩ একর সংরক্ষিত বনভূমির রেকর্ডে তথ্য সংগ্রহে নাই। তবে বর্তমানে এই তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির পরামর্শের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় উচ্চ আদালতের রায়ে ইকোসাইডকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টে অন্তর্ভুক্তের কথা বলা হয়েছে। আদালত মনে করে, পৃথিবীর প্রথম ইকোসাইড আইনটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার প্রণয়ন করবে।
১৪ সুপারিশে যা বলা হয়েছে
পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে জার্মানির নীতি অনুসরণপূর্বক শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, নেদারল্যান্ডের মতো বাইসাইকেলের দেশ হিসেবে তৈরি, প্লাস্টিক ব্যাগ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে ১ হাজার ২০০ বছরের পুরনো জাপানের ঐতিহ্যবাহী ফুরসকি কাপড়ের ব্যাগ তথা বাজার করার ব্যাগ তথা মোড়ানো কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচলন করা, সব জাতীয় পার্ক ও উদ্যানকে আমেরিকার জাতীয় উদ্যানের আদলে বিশেষ করে ইয়োসমেটিক ন্যাশনাল পার্কের আদলে তৈরি, সুন্দরবন রক্ষায় আলাদা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে হাইকোর্ট। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এমএএম