গত বত্সরের শুরুতে সারা বিশ্বের জন্য করোনা ভাইরাস ছিল এক ভয়ংকর সারপ্রাইজ। আমরা অতীতেও মহামারির কথা শুনিয়াছি। এই বিশ্বের পৌনে আট শত কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এখন প্রায় কেহই ১৯১৮-২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সাক্ষী নহেন। ইহার পূর্বে চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগ মহামারি, যাহা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত, তাহাও আমাদের কল্পনার বাহিরে। গত শত বত্সরে বঙ্গদেশে মাঝেমধ্যে ভয়াবহরূপে হানা দিত ‘গুটিবসন্ত’, কলেরা। কিন্তু উহারাও আজ অতীত। বলা যায়, করোনা ভাইরাসের মতো সারা বিশ্বে একযোগে আর কোনো ভাইরাস এইভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াইতে পারে নাই। এই জন্য এমন অতি ভয়ংকর অবস্থাও আগে কখনো ঘটে নাই। করোনার অভিঘাতে বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা বিপন্ন হইয়াছে। স্পষ্ট করিয়া বলিলে, বিশ্বের মোট শ্রমজীবী মানুষের প্রায় ৮১ শতাংশই খুব খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়া দিনাতিপাত করিতেছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, করোনা ভাইরাস মহামারিকালে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩৭ শতাংশ কর্মচারী কাজ হারাইয়াছেন। ৭০ শতাংশ কর্মীর চাকরি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে। ৮৩ শতাংশ ছোট উদ্যোক্তা লোকসানে পড়িয়াছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের বিক্রি কমিয়া গিয়াছে ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করিতে পারিতেছেন না। বাধ্য হইয়া ২১ শতাংশ ব্যবসা বন্ধ করিয়া দিয়াছেন।
করোনা মহামারির ব্যাপারে বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত কোনো দেশেরই কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছিল না। যদিও শিল্পোন্নত দেশসমূহ তাহাদের উত্পাদন কোনোমতে চালু রাখিয়াছে, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের অবস্থা লেজেগোবরে হইয়া গিয়াছে। বিশ্ব অর্থনীতি চলমান থাকে রপ্তানিমুখী আয়ের ওপর নির্ভর করিয়া। আবার পাশাপাশি রপ্তানিও নির্ভর করে আমদানির ওপর। কিন্তু বর্তমানে দুইটিই সারা বিশ্বে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হইতেছে। করোনা কবে নাগাদ সহনশীল পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত হইবে—এখনো বিশ্বের উন্নত দেশসমূহও তাহা বুঝিতে পারিতেছে না। অর্থনীতির চাকা যেইভাবে কাদামাটিতে গাড়িয়া বসিতেছে, করোনা-পরবর্তী দিনগুলিতে সেই কাদামাটি অপসারণ করিয়া অর্থনীতির চাকা পুনরায় সচল করা খুব সহজ হইবে না। যাহারা উত্পাদক, তাহারা এই সময়ের ক্ষতি পুষাইয়া লইতে তাহাদের প্রোডাক্টের মূল্য কয়েক গুণ বৃদ্ধি করিতে বাধ্য হইবে। তাহাতে ব্যয় বাড়িতে জীবনযাত্রারও। যাহারা করোনার আগে সপ্তাহে চার দিন বাহিরে ডিনার করিবার বিলাসিতা দেখাইতে পারিতেন, তাহারা সপ্তাহান্তে একটি দিনের জন্য ডে-আউট করিতে দুইবার ভাবিবেন। তৃতীয় বিশ্বের কথা কল্পনাই করা যায় না। সাধারণ মানুষের হাতে টাকা না থাকিলে অর্থনীতির হূিপণ্ডে ঠিকমতো রক্তসঞ্চালন হইতে পারে না। এমতাবস্থায় দেশের অর্থনীতিও শ্লথ হইয়া পড়ে। এই কারণে বিদায়ি অর্থবছরে (২০২০-২১) সরকারি হিসাবে আর্থিক ক্ষতি ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যানই বলিয়া দিতেছে দেশের অর্থনীতির উপর করোনার কালো ছায়া কীভাবে গ্রাস করিয়াছে। এখন অধিক পরিমাণে টাকা ছাপাইয়া তারল্য বৃদ্ধি করিলে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাইলেও মানুষের হাতে যদি টাকা আসে, তাহা হইলে অর্থনীতির চাকা সার্কুলেট হইতে পারে।
মনে রাখিতে হইবে, করোনার কারণে প্রতিটি দেশেই একধরনের যুদ্ধকালীন অবস্থা তৈরি হইয়াছে। একই দুর্যোগ যখন কোনো অঞ্চল অথবা সারা বিশ্বকে সংক্রমিত করে, তখন যেই সকল দেশ এই সংকট ব্যবস্থাপনায় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে, তাহারাই বিপদ সামলাইতে সমর্থ হয়। গত দেড় বত্সর ধরিয়া করোনার একের পর এক ঢেউ তীব্র হইয়া প্রবাহিত হইতেছে—সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি কত দূর পর্যন্ত কতখানি খারাপ হইতে পারে—তাহা এখনো আমাদের চিন্তার বাহিরে। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আলাদা ম্যানেজমেন্ট তৈরি না করে, তাহা হইলে সামনে দীর্ঘ অন্ধকার রাত দেখা দিবেই। সুতরাং ধানাইপানাই না করিয়া সঠিক ব্যবস্থাপনার বাস্তববাদী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও বাস্তববাদী হইতে হইবে।